
X
ইরান যুদ্ধের দ্বৈতচিত্র
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপট, সময় ও যুদ্ধক্ষেত্র—সবই অনেকটা ইসরায়েলের কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। এই সংঘাত থেকে সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে ইসরায়েল। বিপরীতে যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক ব্যয়ের বড় অংশ বহন করছে ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো, যুক্তরাষ্ট্র এবং পুরো অঞ্চল।
সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই সংঘাত এবং বারবার ভেঙে পড়া যুদ্ধবিরতির ঘটনাগুলো নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে একটি স্পষ্ট দ্বৈতচিত্র সামনে আসে। যুদ্ধের সূচনাকারী দেশ ইসরায়েলই সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত, অথচ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থার কারণে এশিয়া ও আরব বিশ্বের অর্থনীতি বাড়তি চাপের মুখে পড়েছে। একই সময়ে শত শত মার্কিন সেনা হতাহত হয়েছেন। অথচ তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জ একের পর এক নতুন রেকর্ড গড়ছে, ইসরায়েলি শেকেলের মান আরও শক্তিশালী হচ্ছে এবং দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প ইতিহাসের সর্বোচ্চ আয়ের পথে এগোচ্ছে।
অর্থাৎ যে যুদ্ধে ইসরায়েলের নিজস্ব ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেই যুদ্ধেই দেশটি তার প্রধান প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করার পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের ওপর সংকটের ভার চাপিয়ে দিতে পেরেছে। ঠিক সেই প্রবাদ বাক্যটির মতো, 'সাপও মরল, লাঠিও ভাঙল না'।
ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় ধাক্কা
চার দশকের নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবে ইরান সংঘাতকে নিজ ভূখণ্ডের বাইরে রাখতে হিজবুল্লাহ, হুথি এবং ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে একটি শক্তিশালী প্রক্সি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। কিন্তু সেই প্রতিরক্ষা বলয় এখন দ্রুত ভেঙে পড়ছে।
ইরানের প্রতিরোধক্ষমতা ও আঞ্চলিক প্রভাবের মূল ভিত্তি ছিল এই প্রক্সি নেটওয়ার্ক। চলমান যুদ্ধে সেটিই সবচেয়ে বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। ২০২৪ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত এবং সিরিয়ায় কৌশলগত অবস্থান হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়া হিজবুল্লাহ মার্চে আবারও ইরানের পক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে নিজেদের সংকট আরও বাড়িয়ে তোলে। ইসরায়েলের পাল্টা হামলা এবং লেবানন সরকারের চাপের মুখে সংগঠনটির সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হয় এবং নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। একই সময়ে ইরানপন্থী ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে ইরানপন্থী নুরি আল-মালিকির ক্ষমতায় ফেরা ঠেকিয়ে আলি আল-জায়েদিকে প্রধানমন্ত্রী করতে সক্ষম হয়। জায়েদি সরকার সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করতে যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। অন্যথায় অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ কঠোর পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
হুথিরা শুরুতে যুদ্ধে জড়াতে অনিচ্ছুক থাকলেও শেষ পর্যন্ত সংঘাতে অংশ নেয়। তবে সৌদি আরবের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে তারাও শক্ত প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ফলে যুদ্ধের প্রধান চাপ এখন কার্যত ইরানের ওপরই এসে পড়েছে। এটিই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় কৌশলগত সাফল্য। দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তোলা ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং বহু ফ্রন্ট থেকে ইসরায়েলকে ঘিরে রাখার কৌশলগত বলয় ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।
যুদ্ধেও চাপহীন ইসরায়েল
যুদ্ধের শুরুতে ইরানের ছোড়া অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্রই ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিহত করে। বিপরীতে উপসাগরীয় দেশগুলো সামরিক, জ্বালানি ও বেসামরিক অবকাঠামোয় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে। বর্তমানে ইরান মূলত উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানের অবকাঠামোকে লক্ষ্য করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী কিংবা ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ডে বড় ধরনের হামলা এড়িয়ে চলছে, যাতে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত না হয় এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ বজায় থাকে।
ফলে যুদ্ধের মূল আঘাত থেকে অনেকটাই বাইরে রয়েছে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ড। ইসরায়েলের প্রতিরোধমূলক ব্যয়ের বড় অংশ এখন বহন করছে উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক মানুষ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, সামরিক অবকাঠামো ও নেতৃত্ব দুর্বল হওয়ায় ইসরায়েল কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে, অথচ নিজ ভূখণ্ডে তুলনামূলক কম পাল্টা আঘাতের মুখে পড়ছে।
যুদ্ধ থেকে বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক লাভ
ইসরায়েল শুধু যুদ্ধের সামরিক ব্যয়ের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে ঠেলে দিতেই সক্ষম হয়নি; একই সঙ্গে যুদ্ধকালেও তার অর্থনীতিকে শক্ত অবস্থানে ধরে রেখেছে।
যুদ্ধ চললেও ২০২৬ সালে দেশটির অর্থনীতি ৪ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইসরায়েলি শেকেলের প্রায় ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি, তেল আবিব শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক রেকর্ড এবং মার্চেই গুগলের ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে ইসরায়েলভিত্তিক ক্লাউড সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজ (Wiz) অধিগ্রহণ—সবই বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন।
দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম রপ্তানি ১৯ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি এবং টানা পঞ্চম বছরের মতো নতুন রেকর্ড। এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি ক্ষেপণাস্ত্র ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যার কার্যকারিতা বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রমাণিত হচ্ছে। প্রতিটি নতুন সংঘর্ষই ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য সম্ভাব্য ক্রেতাদের সামনে এক ধরনের 'জীবন্ত প্রদর্শনী' হয়ে উঠছে।
জ্বালানি খাতেও ইসরায়েল লাভবান হচ্ছে। লেভিয়াথান ও তামার গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত গ্যাস মিসরে পাঠিয়ে এলএনজি হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। একই সময়ে ইসরায়েলের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলো স্বাভাবিকভাবে সচল থাকলেও হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অবরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উপসাগরীয় দেশগুলো এবং তাদের এশীয় বাণিজ্যিক অংশীদারেরা।
চোরাবালিতে ইরান
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, ইসরায়েল সম্পূর্ণ ব্যয়হীন একটি যুদ্ধ লড়ছে। যুদ্ধের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, অর্থনৈতিক উৎপাদন যুদ্ধ-পূর্ব পূর্বাভাসের তুলনায় কমেছে এবং দীর্ঘ সময় সেনা সমাবেশ বজায় রাখায় সামাজিক ও আর্থিক—উভয় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
তবে কোনো যুদ্ধের সাফল্য কেবল কত ব্যয় হয়েছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং ব্যয়ের তুলনায় অর্জিত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক লাভ দিয়েই তার প্রকৃত মূল্যায়ন করা হয়। সেই মানদণ্ডে বিচার করলে, ইসরায়েলের অবস্থান তার প্রধান প্রতিপক্ষ ইরানের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হয়।
এখানেই বর্তমান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় দ্বৈতচিত্র। ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অর্জন সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক বিজয় নয়; বরং মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত পরিবেশকে নিজের অনুকূলে বদলে ইরানের জন্য এক ধরনের 'চোরাবালি' তৈরি করা। ফলে ইরানের প্রক্সি ও মিত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর চাপ দ্রুত বেড়েছে, দেশটিকে একাধিক যুদ্ধক্ষেত্রে একসঙ্গে সামরিক মনোযোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং যুদ্ধের তাৎক্ষণিক ব্যয়ের বড় অংশ অন্য আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর ওপর স্থানান্তরিত হয়েছে।
অর্থাৎ এই যুদ্ধের ব্যয় এবং পরোক্ষ লাভ-ক্ষতির হিসাব এখন স্পষ্টভাবেই অসম। তবে এই অসমতা সাময়িক, নাকি মধ্যপ্রাচ্যের নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতার ভিত্তি হয়ে উঠবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই নিশ্চিতভাবে দেওয়া সম্ভব নয়।
লেখক: সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক গবেষক