
X
তিউনিসিয়ার আরব বসন্ত
২০১১ সালের আরব বসন্তের সূতিকাগার তিউনিসিয়াকে একসময় আরব বিশ্বের গণতান্ত্রিক উত্তরণের সবচেয়ে সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক জিন এল আবিদিন বেন আলিকে গণআন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর দেশটি এমন এক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করেছিল, যা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অন্য অনেক দেশের ব্যর্থ অভিজ্ঞতার বিপরীতে একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
বেন আলির পতনের পর তিউনিসিয়া নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে, বহুদলীয় নির্বাচন আয়োজন করে এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের নজির স্থাপন করে। রাজনৈতিক বিভাজন ও মতপার্থক্য সত্ত্বেও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। এই অভিজ্ঞতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৫ সালে তিউনিসিয়ার ন্যাশনাল ডায়ালগ কোয়ার্টেট নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে। তখন অনেক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, আরব বিশ্বের রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে স্বপ্ন আরব বসন্তের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল, তার সবচেয়ে বাস্তব রূপ দেখা যাচ্ছে তিউনিসিয়ায়।
কিন্তু সেই আশাবাদ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক দশকের মধ্যেই দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ২০২১ সালের ২৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ পার্লামেন্টের কার্যক্রম স্থগিত করেন, প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করেন এবং নির্বাহী ক্ষমতা নিজের হাতে তুলে নেন। তিনি দাবি করেন, দুর্নীতি, রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে জনগণের দাবির প্রতিফলন হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
প্রথম দিকে সাঈদের সমর্থকদের বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল। কারণ তিউনিসিয়ার সাধারণ মানুষের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক অভিজাতদের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ছিল। প্রেসিডেন্ট নিজেকে পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থাকা একজন সংস্কারক হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতির ভিন্ন চিত্র সামনে আসে। পার্লামেন্ট স্থগিতের পর ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। পরে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া, নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্য দিয়ে দেশটির ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তিত হয়। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও তিউনিসিয়ার এই রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ফ্রিডম হাউস- এর বিভিন্ন মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের পর দেশটির রাজনৈতিক অধিকার, নির্বাচনব্যবস্থা এবং নাগরিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবনতি ঘটেছে। যে দেশটি একসময় আরব বিশ্বের গণতান্ত্রিক আশার প্রতীক ছিল, সেটিই এখন গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতিও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ–এর প্রতিবেদনে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং বিচারিক চাপ বৃদ্ধির বিষয়টি উঠে এসেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে।
রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সমস্যাও তিউনিসিয়ার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আরব বসন্তের সময় জনগণের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনযাত্রা। কিন্তু এক দশক পরও দেশটি উচ্চ বেকারত্ব, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক ঋণের চাপ থেকে বের হতে পারেনি।
তিউনিসিয়ার অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ মহামারির প্রভাব এবং ইউক্রেন যুদ্ধের পর খাদ্য ও জ্বালানি সংকট দেশটির অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার এবং আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে পরামর্শ দিয়ে আসছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে তিউনিসিয়ার ঋণ সহায়তা নিয়ে আলোচনা ছিল দেশটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইএমএফ সাধারণত সরকারি ব্যয় কমানো, ভর্তুকি সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেয়। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কাইস সাঈদ এসব শর্তকে অনেক সময় জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর বাইরের চাপ হিসেবে দেখিয়েছেন। এর ফলে ঋণ সহায়তা ও কাঠামোগত সংস্কারের ক্ষেত্রে অগ্রগতি ধীর হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক- এর বিশ্লেষণেও তিউনিসিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও নীতির ধারাবাহিকতার অভাব দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করে।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও সংকট স্পষ্ট। মন্ত্রী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ঘন ঘন পরিবর্তন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলেছে। অনেক কর্মকর্তা ঝুঁঁকি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অনীহা প্রকাশ করেন, কারণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা কমেছে।
তবে অভ্যন্তরীণ সংকট সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তিউনিসিয়ার গুরুত্ব কমেনি। উত্তর আফ্রিকা, ভূমধ্যসাগর এবং সাহেল অঞ্চলের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিরাপত্তা কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। প্রতিবেশি লিবিয়ার অস্থিতিশীলতা, সাহেল অঞ্চলে জঙ্গিগোষ্ঠীর বিস্তার এবং ইউরোপমুখী অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে তিউনিসিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
এই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাই পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। একদিকে তারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নিতে চায়; অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবাদ দমন এবং অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে তিউনিসিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রাখতেও আগ্রহী।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, তিউনিসিয়ার রাজনৈতিক সংকট শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি উত্তর আফ্রিকার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। একইভাবে কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস (কার্নেগি এন্ডাওমেন্ট)- মনে করে, তিউনিসিয়াকে ঘিরে পশ্চিমা দেশগুলোর নীতি মূলত মূল্যবোধ ও কৌশলগত স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা।
এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো তিউনিসিয়ার গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি। কারণ দেশটিকে হারালে উত্তর আফ্রিকায় রাশিয়া ও চীনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে- এমন আশঙ্কাও রয়েছে।
তবে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কোনো দেশের রাজনৈতিক বৈধতার বিকল্প হতে পারে না। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন কার্যকর প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা।
পার্লামেন্ট স্থগিতের ৫ বছর পর তিউনিসিয়া তাই এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আরব বসন্ত দেশটিকে গণতন্ত্রের সম্ভাবনা দেখিয়েছিল, কিন্তু সেই সম্ভাবনা এখনো স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি পায়নি। একদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ; পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ- সব মিলিয়ে দেশটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থাকবে তিউনিসিয়া কি আবার অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র, রাজনৈতিক ভারসাম্য ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের পথে ফিরতে পারবে, নাকি উত্তর আফ্রিকার আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিণত হবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু তিউনিসিয়ার ভবিষ্যৎ নয়, আরব বসন্তের উত্তরাধিকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
লেখক : সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক গবেষক