
X
সংগৃহীত ছবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত অগ্রগতি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বহু প্রচলিত একটি ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অলাভজনক’ বা ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ অনুষদ, বিভাগ কিংবা স্কুল এবং এসব বিষয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের গড়পড়তা মেধাবী বলে মনে করা হত। এর পেছনে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এসব বিষয়ের শিক্ষাক্রম অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখে না, জনজীবনের সমস্যার সঙ্গে পর্যাপ্ত সংযোগ স্থাপন করতে পারে না এবং দ্রুত পরিবর্তিত বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে ব্যর্থ।
চাকরির বাজারে সুযোগ সীমিত-এমন ধারণাও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বাংলাদেশেও মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের অনুষদগুলো নীতিগতভাবে টিকে থাকলেও শিক্ষাক্রমের আধুনিকায়ন, গবেষণা, মানোন্নয়ন ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে ক্রমেই পিছিয়ে পড়েছে।
কিন্তু এআই যুগ স্পষ্ট করে দিচ্ছে, প্রযুক্তির দায়িত্বশীল বিকাশ মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও বিশ্লেষণী সক্ষমতা ছাড়া সম্ভব নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা, গবেষণা এবং মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন করে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির এই সময়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো উপলব্ধি করেছে, ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষা কেবল প্রযুক্তিনির্ভর হলে চলবে না; এর ভিত্তি হতে হবে মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধ, অর্থাৎ মানবকল্যাণমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। কারণ, যন্ত্র যত বেশি তথ্য বিশ্লেষণ, জ্ঞান উৎপাদন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাজসহ নৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডের দায়িত্ব গ্রহণ করছে, ততই মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা, সংস্কৃতি, পরিচয়, সুশাসন, পরমতসহিষ্ণুতা এবং সামাজিক সম্পর্ক বোঝার গুরুত্ব বাড়ছে। প্রযুক্তি তথ্য সরবরাহ করতে পারে, কিন্তু সেই তথ্যের অর্থ নির্ধারণ, নৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা সামাজিক বাস্তবতা ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা এখনো মানুষেরই। আর সেই সক্ষমতা গড়ে তুলতে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান সর্বকালেই সর্বশ্রেষ্ঠ ভূমিকা পালন করে এসেছে।
এই উপলব্ধির ফলেই বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান নতুনভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করছে। তারা আর কেবল বিভাগভিত্তিক বিদ্যাচর্চায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, গণতান্ত্রিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য, ডিজিটাল সমাজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার, জনস্বাস্থ্য এবং টেকসই উন্নয়নের মতো বাস্তব সমস্যাকে শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, দর্শন, ভাষা, গণমাধ্যম, শিক্ষা, ভূগোল এবং নৃবিজ্ঞান- এসব শাখা এখন একে অপরের পরিপূরক হয়ে আন্তঃবিষয়ক জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। এতে কোনো বিদ্যাশাখার স্বাতন্ত্র্যতা অক্ষুণ্ন রেখেই প্রতিটি শাস্ত্র বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতা বিশ্লেষণে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণেও মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের ভূমিকা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এআইনির্ভর শিক্ষা, আজীবন শিক্ষার ধারণা, সময়োপযোগী শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির প্রতি জনআস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এসব অনুষদের গবেষণা এখন কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠছে।
যে জ্ঞানকে একসময় কেবল ‘প্রেক্ষিতভিত্তিক’ বলে মনে করা হতো, সেটিই আজ এআই যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে-অর্থাৎ পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শিক্ষণপ্রক্রিয়া পুনর্গঠনে- অপরিহার্য হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীরা শিক্ষার্থীদের আচরণ, অন্তর্ভুক্তি এবং সামাজিক বৈষম্যবিরোধী প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের বাস্তবতা অনুধাবনে সহায়তা করছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও আইনবিদেরা সুশাসন, নীতিনির্ধারণ, নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং জনসম্পৃক্ততা শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। অন্যদিকে ইতিহাসবিদ, দার্শনিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য, জনআস্থা এবং সমাজের প্রতি নাগরিক দায়িত্বের প্রশ্নগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। ফলে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রান্তিক অনুষদ নয়; বরং নীতি, পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তরের অন্যতম চালিকাশক্তি।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কর্মসংস্থানের ধারণায়। দীর্ঘদিন মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানকে সীমিত প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক চাকরির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়েছে। অথচ বর্তমান বাস্তবতা বলছে, ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্রে, বিশেষ করে নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্বের পর্যায়ে বিশ্লেষণী দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, নৈতিক বিচারবোধ, কার্যকর যোগাযোগ এবং জটিল সমস্যা সমাধানের সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বাড়বে। তাই বিশ্বের অগ্রণী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম এমনভাবে পুনর্গঠন করছে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তব সমস্যা সমাধান, নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্বের দক্ষতাও অর্জন করতে পারে। ফলে শিক্ষা আর শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকছে না; শিক্ষার্থীরা বাস্তব সমস্যাভিত্তিক গবেষণা, নীতিপর্যবেক্ষণ ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অর্জিত জ্ঞান বাস্তবে প্রয়োগের সক্ষমতা গড়ে তুলছে।
অবশ্য এই পরিবর্তন সব ক্ষেত্রে সমানভাবে ঘটেনি। অনেক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেবার পরিবর্তে গতানুগতিকতা বিষয়ভিত্তিক সীমাবদ্ধতা কিংবা ব্যয়সংকোচনের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টায় ক্রমেই প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। বিপরীতে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন রেখে নিজস্ব শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য দিয়ে সমাজের সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, তারাই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব দিচ্ছে। একাডেমিক উৎকর্ষের অর্থ জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সমাজের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা। পরিবর্তনশীল বিশ্বে পেশা, প্রযুক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। আধুনিক শিক্ষা স্নাতকদের বয়ান, পরিচয়, মূল্যবোধ, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জনপরিসর এবং ক্ষমতার গতিশীলতা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনকে গভীরভাবে বোঝার সক্ষমতা দেয়। ফলে তারা পরিবর্তন মানিয়ে নেবার পাশাপাশি পরিবর্তনের অর্থ, প্রভাব ও দিকনির্দেশনাও অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।
বাংলাদেশের জন্যও এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশে উচ্চশিক্ষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ওপর জোর দেওয়া হয়, যা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। তবে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানকে দুর্বল করে প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। বর্তমান ও ভবিষ্যতের পৃথিবী প্রযুক্তিনির্ভর হলেও তা কম মানবিক নয়; বরং আরও বেশি মানবিক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও সামাজিক বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ভাষা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে মানবিক ও সামাজিক বিশ্লেষণও অপরিহার্য। প্রযুক্তি সমাধানের উপায় দেখাতে পারে, কিন্তু কোন সমাধানটি ন্যায়সংগত, গ্রহণযোগ্য ও মানুষের কল্যাণে সর্বাধিক কার্যকর হবে, তার উত্তর মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের কাছ থেকেই আসে। তাই ভবিষ্যৎ নির্মাণে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান কোনো প্রতিবন্ধক নয়; বরং অপরিহার্য ভিত্তি।
এখন সময় এসেছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার। শিক্ষাক্রম আধুনিকায়ন, আন্তঃবিষয়ক গবেষণার প্রসার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং নীতিনির্ধারণে এসব শাখার সক্রিয় সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও শিল্পখাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তুলে মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের জ্ঞানকে জননীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের ভিত্তি কেবল প্রযুক্তি নয়, মানবিক বোধ, নৈতিকতা ও সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিও। তাই মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানকে প্রান্তিক নয়, ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবেই বিবেচনা করার সময় এসেছে।
লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক