গণভোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার কেন বেআইনি

শাহ্‌দীন মালিক ও সিনথিয়া ফরিদ

মতামত

গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি একই সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ভোট আয়োজনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি

2026-02-02T12:24:15+00:00
2026-02-02T12:24:15+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
গণভোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরকারের প্রচার কেন বেআইনি
শাহ্‌দীন মালিক ও সিনথিয়া ফরিদ
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম   (ভিজিট : ৭৯)
প্রতীকী ছবি
X

প্রতীকী ছবি


গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি একই সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধানে ভোট আয়োজনের প্রশাসনিক প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সদস্যরা প্রকাশ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারে যুক্ত হয়েছেন।

দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই নির্বাচন সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটি। এমন সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, আইনগতভাবেও গভীর উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। এর আগে বারবার যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল– হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারে আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক ব্যাখ্যায় স্পষ্ট– বিদ্যমান আইনের অধীনে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচার নিষিদ্ধ। তবে এই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ হবে এবং এই সীমাবদ্ধতা কোন কোন ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, সে বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ

এই গণভোট একটি নির্দিষ্ট আইনগত কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যার ভিত্তি হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ বা আরপিও। এটি বাংলাদেশের নির্বাচন-সংক্রান্ত মূল আইন। এই আদেশে ভোট কীভাবে অনুষ্ঠিত ও গণনা হবে তা যেমন নির্ধারিত, তেমনি ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোন ধরনের আচরণ অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে, সেটিও স্পষ্টভাবে বলা আছে।

তবে গণভোট কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। বাংলাদেশের সংবিধানে সার্বজনিক গণভোট আয়োজনের জন্য কোনো স্থায়ী আইনগত কাঠামো নেই। সে কারণেই একটি পৃথক আইন প্রণয়ন করা হয়েছে– গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫। অধ্যাদেশটি বর্তমান গণভোট পরিচালনার জন্যই বিশেষভাবে জারি করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অধ্যাদেশ আরপিওর বাইরে কোনো স্বতন্ত্র বা বিচ্ছিন্ন কাঠামো তৈরি করেনি। বরং এটি গণভোটকে বিদ্যমান আরপিও আইন কাঠামোতেই যুক্ত করেছে।

গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারা স্পষ্টভাবে বলেছে, আরপিওর অধীনে যেসব কার্যাবলি নির্বাচন-অপরাধ হিসেবে গণ্য, সেগুলো গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর যৌক্তিক ততটুককু প্রযোজ্য হবে। এর অর্থ হলো, গণভোট আইন ও আরপিও আলাদা করে নয়, একসঙ্গে পড়তে হবে। কিছু নির্বাচনী বিধান প্রার্থীভিত্তিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রণীত; সেগুলো গণভোটে প্রযোজ্য নয়। কিন্তু এর বাইরে যেসব বিধান নির্বাচন পরিচালনা ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে প্রণীত, সেগুলো গণভোটের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। ২০২৫ সালের গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারায় ‘যতদূর প্রযোজ্য’ কথাটির মাধ্যমে নির্বাচন আইনের মৌলিক সুরক্ষাগুলো গণভোটে প্রযোজ্য হয়েছে।

এই ক্ষেত্রে যে বিধানটি স্পষ্টভাবে গণভোটে প্রযোজ্য হবে, তা হলো আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ। অনুচ্ছেদটি ভোট চলাকালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার-সংক্রান্ত। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সরকারি কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি তার দাপ্তরিক অবস্থান বা ক্ষমতা ব্যবহার করে ভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড। এই ধারাটি নির্বাচনের একটি মৌলিক নীতি রক্ষা করে– জনগণের ভোট যেন রাষ্ট্রের প্রভাবমুক্ত থাকে। সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার শুধু জনগণের; রাষ্ট্র সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে না। অর্থাৎ নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত সরকারি কর্মচারীরা (রিটার্নিং অফিসার, অ্যাসিস্ট্যান্ট রিটার্নিং অফিসার ইত্যাদি) নির্বাচনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারেন না।

পক্ষে অথবা বিপক্ষে অবস্থান নিলে বা প্রচারণা চালালে সেটা হবে ৮৬ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং শাস্তিযোগ্য নির্বাচনী অপরাধ। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল নির্বাচন পরিচালনায় সরাসরি যুক্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; দাপ্তরিক অবস্থান ব্যবহার করে ভোটের ফল প্রভাবিত করার যে কোনো রাষ্ট্রীয় চেষ্টা এর আওতায় পড়ে।

আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ যে গণভোটের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ খোদ রাষ্ট্রই দিয়েছে গত বছর এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের মাধ্যমে। ২০২৫ সালে আরপিও দুই দফা সংশোধিত হয়েছে– গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫। এসব সংশোধনীতে প্রচার আচরণ, ভুয়া তথ্য, ডাকযোগে ভোট, প্রয়োগ ক্ষমতা, বিচার প্রক্রিয়া– সবকিছুই নতুনভাবে সাজানো হয়েছে। ৮৬ অনুচ্ছেদটি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ গণভোট অধ্যাদেশে বলা হয়েছে যে আরপিওর অধীনে নির্বাচনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কোনো পক্ষ অবলম্বন করলে, যে অপরাধ করবেন সেটি গণভোটের ব্যাপারে একইভাবে অপরাধমূলক কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হবে। তাহলে আইনের অবস্থান স্পষ্ট। আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ বাধ্যতামূলক। 

গণভোটে প্রচারের অধিকার কার

গণভোটের ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিক, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের সদস্য এবং রাজনৈতিক কর্মীরা গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচার চালাতে পারেন। তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ধারক নন। ফলে দাপ্তরিক অবস্থান ব্যবহার করে জনমত প্রভাবিত করার প্রশ্ন তাদের ক্ষেত্রে ওঠে না। সরকারি পদধারীরা ভিন্ন অবস্থানে। আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সরকারি কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি তার দাপ্তরিক অবস্থান, কর্তৃত্ব বা প্রভাব ব্যবহার করে গণভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তা সরাসরি নিষিদ্ধ এবং ফৌজদারি অপরাধ। উপদেষ্টা বা মন্ত্রীসদৃশ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ যদি রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদাবলে গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণ করেন, তাহলে এই নিষেধাজ্ঞা তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

সংবিধানের ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিরা, কর্মকর্তা বা কর্মচারীরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য। অর্থাৎ ডিসি, এসপি, সচিব বা অন্য কোনো কর্মচারী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন না। তবে এ ব্যাপারে সংবিধানের ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ সীমিত ব্যতিক্রম সৃষ্টি করেছে। যেখানে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার প্রমুখ প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত হওয়া সত্ত্বেও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। এই অনুচ্ছেদটি ‘অফিস অব প্রফিট’ সংক্রান্ত সীমিত ব্যতিক্রম সৃষ্টি করে। এর উদ্দেশ্য– কিছু সরকারি পদে অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার লক্ষ্যে সংসদ সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হারাবেন কিনা, সেই প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা। এই অনুচ্ছেদ রাজনৈতিক প্রচারের অনুমতি দেয় না। এটি গণভোট বা নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের বৈধতা সৃষ্টি করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো– ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ কোনোভাবেই নির্বাচনী অপরাধ-সংক্রান্ত বিধানকে অকার্যকর করে না। 

এখানেই আরপিওর ৮৬ অনুচ্ছেদ নির্ণায়ক হয়ে ওঠে। এই অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যে, বাংলাদেশের সরকারি কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি যদি তার দাপ্তরিক অবস্থান, কর্তৃত্ব বা প্রভাব ব্যবহার করে ভোটের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি ফৌজদারি অপরাধ। ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা নির্ধারণ করে; ৮৬ অনুচ্ছেদ নির্বাচন-সংক্রান্ত আচরণ নিয়ে কথা বলে। একটি অপরটির ব্যতিক্রম নয়।

ফলে সরকারি কর্মকর্তা বা উপদেষ্টামণ্ডলী– মন্ত্রীসদৃশ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ– যদি রাষ্ট্রীয় অবস্থান, সরকারি প্ল্যাটফর্ম বা দাপ্তরিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালান, তাহলে তা সরাসরি ৮৬ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। তারা গণভোট আয়োজন করতে পারেন, নিয়ম ব্যাখ্যা করতে পারেন, নিরপেক্ষ তথ্য দিতে পারেন। কিন্তু ফলাফলের পক্ষে প্রচার চালানোর আইনি সুযোগ নেই।

এ পর্যন্ত ‘হ্যাঁ’ প্রচারের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা, তার বড় অংশই রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সাংবিধানিক কনভেনশন বা রীতির প্রশ্নে। অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটের পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারণায় অংশগ্রহণ করবে না, এটাই স্বাভাবিক সাংবিধানিক প্রত্যাশা। স্বাভাবিক প্রত্যাশা যখন আচরণকে সংযত করতে পারেনি, তখন আইনের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নিশ্চয়ই সরকার উপেক্ষা করতে পারবে না। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এই আইনগত নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য বিতর্ক দমন নয়; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অধীনে অনুষ্ঠিত গণভোটের বিশ্বাসযোগ্যতা ও বৈধতা রক্ষা করা। গণতান্ত্রিক ফল নিশ্চিত করার জন্য সরকারের উচিত আইন লঙ্ঘনের মাধ্যমে ফল প্রভাবিত করার চেষ্টার বদলে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া ও ভোটারের ওপর আস্থা রাখা।

ড. শাহ্দীন মালিক: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; ড. সিনথিয়া ফরিদ: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও গবেষক, চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অব হংকং





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy