প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১:২৪ পিএম আপডেট: ০২.০২.২০২৬ ২:১১ পিএম (ভিজিট : ১৬০)

X
অধ্যাপক ইমান আলী (১৯২৬-১৯৯৬)
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলা বরাবরই অবহেলিত জনপদ। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলে দুঃখ-দুর্দশা ছিল আরও প্রকট। মূল জনপদ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিল অনুন্নত। শিক্ষার সুযোগ ছিল না বললেই চলে। মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এত খারাপ ছিল, শিক্ষা গ্রহণের চিন্তা ছিল তাদের জন্য এক প্রকার বিলাসিতা।
এ রকমই এক পরিস্থিতিতে ১৯২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রৌমারীর পাখীউড়া গ্রামের এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন অধ্যাপক ইমান আলী। তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি হয় টাপুরচর মাদ্রাসায়। সেখান থেকে তিনি আসামের সুখচরে এম.ই. স্কুলে (মিডল ইংলিশ স্কুল) তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৩৯ সালে এই স্কুল থেকে জুনিয়র স্কুল ফাইনাল (৬ষ্ঠ শ্রেণিতে) পরীক্ষায় তিনি অসাধারণ মেধাশক্তির পরিচয় দেন। তিনি এ পরীক্ষায় আসাম প্রদেশে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৯৪৪ সালে আসামের ধুবড়ী সরকারি হাই স্কুল থেকে দুই বিষয়ে লেটার নম্বরসহ প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অনুষ্ঠিত এ পরীক্ষায় পূর্ব বাংলায় ইমান আলী ছিলেন প্রথম শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী ছাত্র। আইএসসি পড়ার জন্য ইমান আলী গৌহাটি কলেজে ভর্তি হন। কলেজে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ছাত্র হলেও বাড়ি বঙ্গ প্রদেশে হওয়ায় তাঁকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ছাত্রকে বৃত্তি দেওয়া হয়।
আর্থিক অনটনের কারণে ইমান আলী চলে আসেন টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজে। তখন সা’দত কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ ছিল না। তিনি গণিতসহ আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। ঢাকা বিভাগে প্রথম স্থান দখল করে ইমান আলী আইএ পাস করেন। স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রির জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগে। এখানেও তিনি প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং স্বর্ণপদক পান। এমএ অধ্যয়নকালে আর্থিক ও মানসিক কষ্টে ভোগেন ইমান আলী। এ স্তরে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি।
১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তিনি জগন্নাথ কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন গণিতের প্রভাষক হিসেবে। ১৯৬৩ সালের জুন মাসে তৎকালীন ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (আজকের বুয়েট) যোগদান করেন। ১৯৬৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি করার জন্য বৃত্তি লাভ করেন। কিন্তু অসুস্থ ইমান আলীর দেহ ভীষণভাবে ভেঙে পড়ায় গবেষণা সমাপ্ত না করেই দেশে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে বুয়েট থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
যদি বলা হয়, প্রচণ্ড আর্থসামাজিক প্রতিকূলতা ইমান আলীর পর্বতসম প্রতিভার সম্পূর্ণ বিকাশ ঘটাতে দেয়নি, তাহলে ভুল বলা হবে না। আবার প্রতিভার যোগ্য সম্মান তিনি সব ক্ষেত্রে পেয়েছেন, সেটাও বলা যায় না। ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে আক্রান্ত ইমান আলী এ অশান্তি নিয়েই জীবনের অধিকাংশ সময় পার করেছেন। তবে এ অশান্তি তাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি। এরই মধ্যে তিনি রচনা করেছেন গণিত নিয়ে বহু মূল্যবান গ্রন্থ। এগুলো আজও ছাত্রছাত্রীদের কাছে সমাদৃত।
ইমান আলীর জীবনসঙ্গী রহিমা খাতুনের কথা না বললে অন্যায় হবে। তাঁর সমস্ত বইয়ের জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, পরিমিতি চিত্র ও অঙ্কন নিজ হাতে করেছেন ওই মহীয়সী নারী। ইমান আলী তাঁর সব বই উৎসর্গ করেছেন স্ত্রীর নামে। ১৯৮৬ সালে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় রহিমা খাতুন মৃত্যুবরণ করেন। বিপত্নীক অধ্যাপক ইমান আলী তাঁর ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে পুরান ঢাকার প্যারীদাস রোডে নিজ বাসগৃহ সায়েন্স কর্নারে শেষ দিনগুলো কাটান। ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ওই বাড়িতেই মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁকে সমাহিত করা হয় তাঁর নিজ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে বাবা-মায়ের পাশে।
শনিবার ১ ফেব্রুয়ারি ছিল এ মহান গণিতবিদের জন্মশতবার্ষিকী। তাঁর প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।
ফারুক আহমেদ স্বপন: সাবেক ছাত্রনেতা