পিলখানা হত্যাকাণ্ড: আজও যেসব প্রশ্ন রাষ্ট্র এড়িয়ে যাচ্ছে

মোহাম্মদ জাহিদ

মতামত

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি এক গভীর জাতীয় ট্র্যাজেডির দিন। পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে সীমান্তরক্ষী

2026-02-12T17:54:58+00:00
2026-02-12T17:54:58+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
পিলখানা হত্যাকাণ্ড: আজও যেসব প্রশ্ন রাষ্ট্র এড়িয়ে যাচ্ছে
মোহাম্মদ জাহিদ
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৫:৫৪ পিএম   (ভিজিট : ৮২)
X

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি এক গভীর জাতীয় ট্র্যাজেডির দিন। পিলখানায় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিডিআরের ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে একসঙ্গে এত সংখ্যক সামরিক কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড শুধু হৃদয়বিদারকই নয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর জন্যও ছিল এক ভয়াবহ ধাক্কা। 

অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও এই হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য আজও জাতির সামনে পরিষ্কার নয়। রাষ্ট্র যখন নীরব থাকে, তখন প্রশ্ন জন্ম নেয়। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব পড়ে ইতিহাস, সাংবাদিকতা ও বিবেকের ওপর। পিলখানার ঘটনাকে সরকারিভাবে “বিদ্রোহ” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু একটি বিদ্রোহ কীভাবে এত পরিকল্পিত, এত নিষ্ঠুর এবং এত বিস্তৃত হত্যাকাণ্ডে রূপ নিল—সে প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য উত্তর আজও মেলেনি। 

বিদ্রোহের নামে যে নৃশংসতা ঘটানো হলো, তার বিচার কি সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণ হয়েছে? নাকি দৃশ্যমান অপরাধীদের আড়ালে রয়ে গেছে অদৃশ্য পরিকল্পনাকারীরা? এই প্রশ্নগুলো উঠলেই আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা অনিবার্য হয়ে পড়ে। কারণ ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদের শুরুতেই। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একটি সরকার হিসেবে তারা শুধু আইনগত বিচার নয়, জাতির কাছে রাজনৈতিক ও নৈতিক জবাবদিহিতারও দায় বহন করত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই জবাবদিহিতা আমরা দেখতে পাইনি। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পর যেভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে, তাতে বহু অসঙ্গতি চোখে পড়ে। তদন্ত রিপোর্টের পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ নিয়ে ছিল অনীহা। বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সেসব প্রশ্নকে বরাবরই “ষড়যন্ত্র তত্ত্ব” বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। 

কিন্তু রাষ্ট্র কি তার নাগরিকদের প্রশ্নকে এভাবে এড়িয়ে যেতে পারে? বিশেষ করে ভারতের ভূমিকা নিয়ে যে সন্দেহ ও আলোচনা জনমনে রয়েছে, তা সম্পূর্ণ অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের সামরিক কাঠামো এক ভয়াবহ ধাক্কা খেয়েছিল—যার কৌশলগত সুবিধা আঞ্চলিক রাজনীতিতে কারা পেয়েছে, সে প্রশ্ন তোলা অস্বাভাবিক নয়। ভারত বাংলাদেশের একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র এবং গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি। কিন্তু বন্ধুত্বের সম্পর্কের আড়ালে যদি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সে বিষয়ে আলোচনা করাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলা যায় না। 

পিলখানার ঘটনার পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি, নিরাপত্তা সহযোগিতার ধরন এবং সামরিক ভারসাম্যের পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে প্রশ্ন ওঠে, এই হত্যাকাণ্ড কি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ছিল, নাকি এর পেছনে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক হিসাব কাজ করেছে? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়িত্ব ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের বদলে সরকার বেছে নিয়েছে নীরবতা ও দমনমূলক কৌশল। যারা পিলখানা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের অনেককেই “রাষ্ট্রবিরোধী” বা “গুজব রটনাকারী” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে করে সত্য উদ্ঘাটনের পথ আরও সংকুচিত হয়েছে। 

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—রাষ্ট্র যখন নিজেই প্রশ্নকে ভয় পায়। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ায়ও এই ভয় স্পষ্ট। হাজার হাজার জওয়ানকে একসঙ্গে অভিযুক্ত করা হয়েছে, অনেককে দীর্ঘদিন বিচার ছাড়াই আটক রাখা হয়েছে। জেলহেফাজতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে, যা রাষ্ট্রের মানবাধিকার রেকর্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কিন্তু মূল পরিকল্পনাকারী কারা, সেই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর আজও অধরা। আওয়ামী লীগ সরকার বারবার দাবি করেছে যে তারা বিচার সম্পন্ন করেছে। কিন্তু বিচার মানেই কি ন্যায়বিচার? নাকি বিচার মানে কেবল একটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সমাপ্তি? 

পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল শুধু সেনা কর্মকর্তাদের ওপর আঘাত নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোর ওপর একটি গভীর আঘাত। সেই আঘাতের ক্ষত আজও শুকায়নি, কারণ সত্যকে আড়াল করে কোনো জাতি কখনো সামনে এগোতে পারে না। আজ যখন আমরা স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় অতিক্রম করেছি, তখন এই প্রশ্ন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে—পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য কি কখনো জাতির সামনে আসবে? নাকি এটি ইতিহাসের অন্ধকার গহ্বরেই চাপা পড়ে থাকবে? 

ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, সম্পর্ক থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বন্ধুত্বের নামে যদি প্রশ্ন তোলার অধিকার হারাতে হয়, তাহলে সেই বন্ধুত্ব ভারসাম্যহীন। একইভাবে, ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যের নামে যদি জাতীয় ট্র্যাজেডির সত্য গোপন করা হয়, তাহলে সেই রাজনীতি আর জনগণের রাজনীতি থাকে না। 

পিলখানা হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে স্বাধীন, আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত হওয়া জরুরি। দলীয় প্রভাবমুক্ত, বিদেশি বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করে একটি বিশ্বাসযোগ্য কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি। কারণ শহীদের আত্মা প্রশ্ন করছে, ইতিহাস প্রশ্ন করছে, আর জাতি জানতে চায়—সত্য কোথায়? সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহসই একটি রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের সত্য উদ্ঘাটন ছাড়া বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র কখনোই পূর্ণতা পাবে না।

লেখক: মোহাম্মদ জাহিদ, সভাপতি, সুশীল ফোরাম (01780146845)






Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy