স্বাস্থ্যসেবার সংস্কার, জবাবদিহিতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার নতুন রূপরেখা: ইঞ্জিনিয়ার একেএম রেজাউল করিম
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চিকিৎসা মানুষের মৌলিক অধিকার কিন্তু বাস্তবে সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে রোগীসেবার মান, সময়সূচি, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে বহু অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জমে আছে। সময় এসেছে সুসংগঠিত সংস্কারের যেখানে সেবা হবে কেন্দ্রবিন্দু, আর দায়িত্বহীনতার জায়গা হবে শূন্য।
দীর্ঘ সময় খোলা থাকবে চিকিৎসাসেবা:
দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সকল ডিপার্টমেন্ট খোলা রাখার প্রস্তাব বাস্তবসম্মত ও জনবান্ধব। বর্তমানে টিকিট কাউন্টার দুপুর ১টা পর্যন্ত খোলা থাকে এতে দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ভোগান্তিতে পড়েন। যদি দুই শিফটে রাত ১০টা পর্যন্ত আউটডোর সেবা চালু থাকে, তবে টিকিট কাউন্টারও কমপক্ষে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকা উচিত।
অন্যদিকে ইমার্জেন্সি বিভাগ ২৪ ঘণ্টা খোলা আছে এবং থাকবে এটি নিশ্চিত করতে হবে প্রয়োজনীয় জনবল, ওষুধ ও যন্ত্রপাতি দিয়ে। ২৪ ঘণ্টার সেবা মানে কেবল দরজা খোলা রাখা নয়; কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
চিকিৎসকের কাজের হিসাব ও জবাবদিহিতা:
কোন ডিপার্টমেন্টের কোন চিকিৎসক দিনে কতজন রোগী দেখেছেন এর স্বচ্ছ হিসাব রাখতে হবে। একটি ডিজিটাল লগ বা ই-হেলথ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করে প্রতিদিনের রোগীসংখ্যা, সময়, চিকিৎসা পরামর্শ ইত্যাদি রেকর্ড রাখা সম্ভব।
যদি কোনো চিকিৎসক নির্ধারিত রোগী-টার্গেট পূরণ না করেন, তবে বিভাগীয় প্রধান কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে পারেন। তবে এখানে লক্ষ্য রাখতে হবে—সংখ্যার চেয়ে গুণগত মান যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। রোগী দেখা যেন কেবল ‘সংখ্যা পূরণ’ না হয়ে ওঠে; বরং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পরামর্শ নিশ্চিত করা হয়।
দক্ষতা-ভিত্তিক বেতন ও পদোন্নতি:
চিকিৎসকদের বেতন বৃদ্ধি ও পদোন্নতি কর্মদক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা, রোগীসন্তুষ্টি এবং দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে একদিকে যেমন ভালো কাজের স্বীকৃতি মিলবে, অন্যদিকে দায়িত্বে অবহেলা কমবে।
একটি স্বাধীন পারফরম্যান্স ইভালুয়েশন বোর্ড গঠন করে নিয়মিত মূল্যায়ন করলে ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ হবে।
প্রাইভেট প্র্যাকটিসের নামে অনিয়ম বন্ধ হোক:
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে সার্জারি বিভাগের কিছু চিকিৎসকের বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালে অপারেশন না করে রোগীকে বারবার প্রাইভেট ক্লিনিকে নেওয়ার চেষ্টা করা। অ্যাবসেস বা টিউমারের মতো ছোটখাটো অপারেশন বিলম্বিত করে রোগীকে ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে নিতে চাপ সৃষ্টি করা অনৈতিক এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়া উচিত। সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অপারেশন থিয়েটার সচল রাখার পাশাপাশি কঠোর নজরদারি ও অভিযোগ গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। হটলাইন ও অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম চালু করলে সাধারণ মানুষ সহজে প্রতিকার চাইতে পারবে।
প্রয়োজনে বিদেশি চিকিৎসক নিয়োগ:
যদি কোনো কারণে পর্যাপ্ত চিকিৎসক দায়িত্ব পালনে অনীহা দেখান বা সেবায় ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে সরকার প্রয়োজনে বিদেশি চিকিৎসক নিয়োগের কথা বিবেচনা করতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো যেমন India, Pakistan, Sri Lanka, Thailand ও Philippines থেকে চুক্তিভিত্তিক বিশেষজ্ঞ আনা যেতে পারে। তবে এটি যেন স্থায়ী সমাধান না হয়ে সাময়িক সহায়ক ব্যবস্থা হয়। মূল লক্ষ্য হতে হবে দেশের নিজস্ব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অঙ্গীকার:
স্বাস্থ্যখাত কোনো ব্যবসার ক্ষেত্র নয় এটি মানুষের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্ন। “সেবার নামে প্রতারণা” বা অমানবিক আচরণ বন্ধ করতে হলে আইনি কঠোরতা, প্রশাসনিক নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা সবকিছুর সমন্বয় দরকার।
গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য সরকারি চিকিৎসার দ্বার সত্যিকার অর্থেই উন্মুক্ত করতে হলে পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা, নার্স ও টেকনিশিয়ানের প্রশিক্ষণ, রোগীবান্ধব ব্যবস্থাপনা সবই নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যখাতের এই সংস্কার কেবল নীতিগত পরিবর্তন নয়; এটি একটি নৈতিক জাগরণ। রাষ্ট্র যদি আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসে এবং চিকিৎসক সমাজ দায়িত্বশীলতার নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তবে একটি মানবিক, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। গরিব-দুঃখী মানুষের চিকিৎসার অধিকার অখণ্ড থাকুক এটাই হোক আমাদের সামষ্টিক অঙ্গীকার।
লেখক: ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র
চেয়ারম্যান- সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
চেয়ারম্যান- ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)