
X
মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়েছে বহু আগে। নক্ষত্র দেখেছে, বিস্মিত হয়েছে, প্রশ্ন করেছে “আমি কে? এই বিশ্ব কোথা থেকে?” সেই প্রশ্নের দুইটি বড় ভাষা তৈরি হয়েছে ইতিহাসে ধর্ম ও বিজ্ঞান। একটিতে অর্থের অনুসন্ধান, অন্যটিতে প্রক্রিয়ার অনুসন্ধান। কিন্তু দ্বন্দ্বের গল্পটা কি সত্যিই ধর্ম বনাম বিজ্ঞান? নাকি গল্পটা আরও সূক্ষ্ম?
১. দন্দ্বের প্রকৃত মানচিত্র: ধর্মের মূল ভাষা হলো অর্থ, উদ্দেশ্য, নৈতিকতা। বিজ্ঞানের মূল ভাষা হলো পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষা, সংশোধন। বিজ্ঞান বলে “কীভাবে”,
ধর্ম বলে “কেন”। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন একে অন্যের জায়গা দখল করতে চায়। যখন ধর্ম বৈজ্ঞানিক সূত্র নির্ধারণ করতে চায়, কিংবা বিজ্ঞান অস্তিত্বের চূড়ান্ত অর্থ নির্ধারণ করতে উদ্যত হয়। তখন দ্বন্দ্বটা ধর্ম বনাম বিজ্ঞান নয় বরং দুইটি জ্ঞানপদ্ধতির সীমানা-সংকট।
২. প্রত্যাদেশ: আক্ষরিকতা না সারবস্তু? ধর্মীয় প্রত্যাদেশ কোনো শূন্য আকাশে ঝুলন্ত শব্দ নয়। তা ভাষায় নাজেল হয়, ইতিহাসে নাজেল হয়, একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে উচ্চারিত হয়। ফলে প্রত্যাদেশে থাকে ঐশী সারবস্তু কিন্তু সেই সারবস্তু মানব ভাষা ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার পোশাক পরে আসে। এইখানেই প্রশ্ন আমরা কি কেবল অক্ষর আঁকড়ে থাকব, নাকি অক্ষরের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য মর্ম উদ্ধার করব? ইসলামী জ্ঞানতত্ত্বে “মাকাসিদ” (বিধানের উদ্দেশ্য) ধারণা এ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। আইন কেবল বিধান নয়, তার পেছনে উদ্দেশ্য আছে মানবকল্যাণ, ন্যায়, জীবনরক্ষা, জ্ঞানরক্ষা, মর্যাদা রক্ষা। যদি অক্ষর সময়ের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে, তখন কি আমরা অক্ষর আঁকড়ে ধরব, নাকি উদ্দেশ্য উদ্ধার করে নতুন প্রেক্ষিতে তা প্রয়োগ করব?
৩. ঐতিহাসিকতা: ভয় না বোধ? অনেকেই আশঙ্কা করেন প্রত্যাদেশকে ঐতিহাসিক বললে তা মানবিক হয়ে যাবে, ঐশী থাকবে না। কিন্তু ইতিহাসের ভেতর দিয়ে নাজেল হওয়া মানে কি ঐশ্বরিকতা নষ্ট হয়ে যাওয়া? বরং বলা যায় ঐশী সারবস্তু ইতিহাসের ভিতর দিয়ে মানবসমাজে কার্যকর হয়। ইতিহাস সেই সারবস্তুর বাহন। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ইতিহাসকে সারবস্তু ভেবে বসা হয়।
৪. বিজ্ঞান: বস্তুবাদ নাকি অনুসন্ধান? আজকের বিশ্বে “বিজ্ঞান” শব্দটি প্রায়শই কর্পোরেট পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মিত প্রযুক্তি-নির্ভর ক্ষমতার বয়ান হিসেবে হাজির হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের আদিম রূপ ছিল বিস্ময় ও অনুসন্ধান। জগতকে বোঝার চেষ্টা। প্রকৃতি কি কেবল বস্তু? নাকি তা নিদর্শন? এখানে দুইটি দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে পারে: বিজ্ঞানকে স্বয়ংসম্পূর্ণ বস্তুবাদী ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা অথবা প্রকৃতি-অনুসন্ধানকে সৃষ্টির চিহ্ন পাঠ হিসেবে দেখা কিন্তু সতর্কতা জরুরি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব পরিবর্তিত হয়। তাই তত্ত্বকে চূড়ান্ত সত্য বানানো যেমন ভুল, তেমনি ধর্মীয় পাঠকে বৈজ্ঞানিক পাঠ্যবই বানানোও ভুল।
৫. অক্ষরবাদ বনাম বিজ্ঞানবাদ ইতিহাসে আমরা দুইটি চরমতা দেখি: একদিকে অক্ষরবাদী ধর্মতত্ত্ব যারা প্রতিটি শব্দকে চিরস্থায়ী আক্ষরিক বিধান মনে করে। অন্যদিকে বিজ্ঞানবাদী অবিশ্বাস যারা মনে করে পরীক্ষাগারেই চূড়ান্ত সত্য নির্ধারিত হয়। দন্দ্বটা আসলে পুরনো বিশ্ববীক্ষা বনাম নতুন বিশ্ববীক্ষার। ধর্ম বনাম বিজ্ঞান নয়। এই দুইয়ের মধ্যবর্তী একদল চিন্তক আছেন যারা প্রত্যাদেশের ভাষা ও উদ্দেশ্যকে গভীরভাবে পড়তে চান, আবার সমকালীন জ্ঞানকেও গুরুত্ব দিতে চান। তাঁরাই সময়ের সত্য-অন্বেষী।
অক্ষর থেকে মর্মে যাত্রা সভ্যতা স্থির নয়। মানুষের জ্ঞান বিকশিত হয়। সামাজিক বাস্তবতা বদলায়। এই পরিবর্তনের মুখে প্রত্যাদেশ-পাঠও নতুন ব্যাখ্যার দাবি তোলে। এখানে “অক্ষর ত্যাগ” নয় বরং “অক্ষরকে অতিক্রম করে উদ্দেশ্যে পৌঁছানো”। বিধান নয়, বিধানের উদ্দেশ্য শব্দ নয়, নৈতিক দিকনির্দেশ ঐতিহাসিক রূপ নয়, চিরন্তন সারবস্তু। এই যাত্রাই অক্ষর থেকে মর্মে উত্তরণ।
উপসংহার: সংঘর্ষ নয়, সংলাপ ধর্ম যদি কেবল অতীতে আটকে যায়, তবে তা জড় হয়ে পড়ে। বিজ্ঞান যদি কেবল বস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা অর্থহীন হয়ে পড়ে। দুইয়ের মধ্যে প্রয়োজন সংলাপ। বিতর্ক থাকবে কিন্তু তা ধ্বংসাত্মক না হয়ে সৃজনশীল হতে পারে। সত্য অনুসন্ধান এক অবিরাম যাত্রা। সৃষ্টির বিকাশের সাথে সাথে বোঝাপড়ারও বিকাশ জরুরি। অক্ষর আমাদের পথ দেখায়, মর্ম আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেয়। আর এই যাত্রায়, প্রশ্ন করা থেমে গেলে জ্ঞানও থেমে যায়।
লেখক : ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম, কলামিষ্ট, সমাজ সেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ।
চেয়ারম্যান -বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র
চেয়ারম্যান - সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট
চেয়ারম্যান - ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি)
চেয়ারম্যান - আলহাজ্ব কে,এম,আব্দুল কারীম রাহিমাহুল্লাহ ট্রাস্ট