বিপন্ন বন্যপ্রাণী: অস্তিত্বের সংকটে প্রকৃতির পাহারাদারেরা

মোঃ আহসান হাবীব শিপলু

মতামত

“হেলায় হারাতে বসেছে বন্যপ্রাণ, অস্তিত্বের লড়াইয়ে বন্যপ্রাণ।”- এই আর্তনাদ আজ কেবল কথার কথা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব।

2026-03-02T14:55:35+00:00
2026-03-02T14:55:35+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
বিপন্ন বন্যপ্রাণী: অস্তিত্বের সংকটে প্রকৃতির পাহারাদারেরা
মোঃ আহসান হাবীব শিপলু
প্রকাশ: সোমবার, ২ মার্চ, ২০২৬, ২:৫৫ পিএম   (ভিজিট : ৬৬৭)
মোঃ আহসান হাবীব শিপলু
X

মোঃ আহসান হাবীব শিপলু

“হেলায় হারাতে বসেছে বন্যপ্রাণ, অস্তিত্বের লড়াইয়ে বন্যপ্রাণ।”- এই আর্তনাদ আজ কেবল কথার কথা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তব। আমাদের চারপাশে দালানকোঠা, রিসোর্ট আর উন্নয়নের মহোৎসব চললেও, সেই তুলনায় বন্যপ্রাণীদের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু আজ বড্ড অপ্রতুল। চুয়াডাঙ্গা সদরের মাখালডাঙ্গা থেকে তিতুদহ সবখানেই আজ একই ছবি; আবাসস্থল হারিয়ে বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে এক অনিবার্য সংঘাত।

সংকটে মেছোবিড়াল ও জলচর পাখি
চুয়াডাঙ্গার মিয়াপাড়া বা মাখালডাঙ্গা ইউনিয়নের কবরস্থানগুলোতে এখন আশ্রয় নিচ্ছে মেছোবিড়াল (বাঘডাসা)। বন জঙ্গল হারিয়ে যাওয়ায় এরা লোকালয়ে চলে আসছে, আর জীবন বাঁচাতে হানা দিচ্ছে গৃহস্থের হাঁস-মুরগি কিংবা পুকুরের মাছে। এতে ক্ষুব্ধ হচ্ছে মানুষ, বাড়ছে সংঘাত। অথচ একটু সচেতন হলেই এদের রক্ষা করা সম্ভব। ২০ জানুয়ারি ২০২৬-এ গোবরগাড়া গ্রামের বয়ারগাড়ি মাঠে একটি কাদাখোঁচা পাখির ঘটনাটি আমাদের আশার আলো দেখায়। ধানের বীজতলায় পাঁচটি ডিম পাড়া সেই পাখিটি আমাদের সংগঠনের মানবিক হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরতে পেরেছে। কিন্তু সবার ভাগ্য এমন হয় না।

এক সময় গ্রামের প্রতিটি বাড়ির পেছনে ঝোপঝাড় ছিল, ছিল নিচু জলাশয় ও বড় বড় গাছ। আজ মানুষ জমির আইলটুকুও ছাড়ছে না। শীতে খেজুর গাছের নিচের ঝোপ পরিষ্কার করা হচ্ছে, ইজারাদারেরা অধিক মাছের আশায় জলাশয়ের জলজ উদ্ভিদ ধ্বংস করছেন। ফলে জলচর পাখিরা বংশবৃদ্ধির সুযোগ পাচ্ছে না। বনবিভাগের হিসেবে ১৭.০৮% বনভূমি থাকলেও FAO বলছে তা মাত্র ১৩.৫%। আইইউসিএন (IUCN) এর মতে, বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে ৩১টি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়েছে এবং ৩৯০টি প্রজাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।

পাচারের কালো থাবা ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট
আবাসন সংকট ছাড়াও বন্যপ্রাণীর জন্য বড় হুমকি হলো চোরাচালান। ২০২৫ সালে চুয়াডাঙ্গার ডিঙ্গেদহ থেকে আমরা ৭০টি হিরামন ও সবুজ টিয়া উদ্ধার করি। মাংস, হাড়, চর্বি আর চামড়ার লোভে পাচারকারীরা বাংলাদেশকে 'সোর্স' ও 'ট্রানজিট' হিসেবে ব্যবহার করছে। তক্ষক ও বনরুই আজ বিলুপ্তির পথে। বিশ্বজুড়ে সাদা গণ্ডার আজ ইতিহাসের পাতায় চলে যাওয়ার উপক্রম; শেষ পুরুষ গণ্ডারটি ২০১৮ সালে বিদায় নিয়েছে।

অথচ বিশ্ব রাজনীতিতে বন্যপ্রাণীর গুরুত্ব অপরিসীম। রাশিয়ার ৬টি যুদ্ধবিমানের বিপরীতে ৬টি হাতি নেওয়া কিংবা চীনের ‘পাণ্ডা কূটনীতি’ প্রমাণ করে বন্যপ্রাণী কেবল প্রাণী নয়, বরং জাতীয় সম্পদ ও শক্তির প্রতীক।

কেন বাঁচাবো বন্যপ্রাণী?
বন্যপ্রাণী না থাকলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হবে, খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়বে। এর ফলে:
● ফসলে কীটনাশকের ব্যবহার বাড়বে, যা মরণব্যাধি ব্যাধি ছড়াবে।
● পরাগায়ণ ব্যাহত হয়ে খাদ্য উৎপাদন কমবে এবং দুর্ভিক্ষ ত্বরান্বিত হবে।
● বনের বিস্তার ও মাটির উর্বরতা কমে যাবে।
● পর্যটন ও মৎস্য শিল্পে ধস নামবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে আঘাত হানবে।
● বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস ও আমাদের দায়বদ্ধতা
২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর ৩রা মার্চ পালিত হয়ে আসছে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস। এবারের দিবসের মূল লক্ষ্য হলো বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের প্রতি গণসচেতনতা বৃদ্ধি করা। এবারের প্রতিপাদ্য হলো—"ভেষজ ও সুগন্ধি উদ্ভিদ : স্বাস্থ্য, ঐতিহ্য এবং জীবিকা সুরক্ষা "

আমরা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব। তাই শুধু নিজেদের আরাম-আয়েশ নয়, অন্য প্রাণীর নিরাপত্তাও আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। বনবিভাগের স্বল্প লোকবলের সাথে দেশের ২৫০টিরও বেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আজ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। আসুন, মানবসভ্যতা অক্ষুণ্ণ রাখতে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে আমরা বন্যপ্রাণীদের ভালোবাসতে শিখি। এই সচেতনতার বার্তা পৌঁছে যাক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

লেখক: 
প্রভাষক (প্রাণিবিদ্যা), বড় সলুয়া নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ
ও সভাপতি, বাংলাদেশ ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড নেচার ইনিশিয়েটিভ।





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy