মেট্রোরেল আর ফ্লাইওভারে বদলে যাচ্ছে ঢাকার দৃশ্যপট। কিন্তু এই ঝকঝকে অবকাঠামোর আড়ালে ঢাকার চিরচেনা গণপরিবহন অর্থাৎ লোকাল বাসগুলোতে নারী ও শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের যাতায়াত এখনো এক সংগ্রামের নাম। ঢাকার উন্নয়ন তখনই সার্থক হবে, যখন রাজধানীর প্রতিটি নারী ভয়হীন চিত্তে এবং নিরাপদ বোধ করে কর্মস্থলে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারবেন।
ঢাকার রাজপথের বর্তমান চিত্র:
নারী ও ছাত্রীদের বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে ঢাকার প্রতিটি বাস স্টপেজে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত মানুষের মধ্যে লড়াই করে ওঠা নামা করাটা সবচেয়ে কঠিন। লোকাল বাসগুলোতে ওঠার যুদ্ধ থেকে শুরু করে ভেতরে তিল ধারণের জায়গা না থাকা এই ভিড়ের সুযোগে নারীদের প্রায়ই নানা ধরণের হয়রানির সম্মুখীন হতে হয়। অনেক সময় ভিড় এড়াতে নারীরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন অথবা কয়েকগুণ বেশি ভাড়া দিয়ে বিকল্প পথে যাতায়াত করেন, যা তাদের অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থাকে নারীবান্ধব করতে যে বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া জরুরি:
১. ডেডিকেটেড বাস সার্ভিস: বিআরটিসি’র মতো সাধারণ বাসগুলোতেও নারীদের জন্য বাসের সংখ্যা বাড়ানো এবং বিশেষ করে অফিস ও স্কুল-কলেজ ছুটির সময়ে কেবল নারীদের জন্য 'স্পেশাল ট্রিপ' নিশ্চিত করা।
২. স্টপেজ ও ফুটপাতে নিরাপত্তা: ঢাকার প্রতিটি বাস স্টপেজে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা, যাতে রাতের ঢাকাও নারীদের জন্য অনিরাপদ না থাকে।
৩. অনলাইন মনিটরিং: ঢাকার প্রতিটি রুটের বাসের ভেতরে অভিযোগ বক্স এবং ডিজিটাল ডিসপ্লেতে জরুরি সহায়তা নম্বর (যেমন ৯৯৯) প্রদর্শন করা।
৪. পরিবহন শ্রমিকদের সচেতনতা: গাবতলী, সায়েদাবাদ বা মহাখালীর মতো বড় টার্মিনালগুলোতে নিয়মিত চালক ও সহকারীদের কাউন্সিলিং করা।
উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি:
ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। এই শহরের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তারা যদি বাসে উঠতে গিয়ে কুন্ঠিত বোধ করেন বা অনিরাপদ মনে করেন, তবে ফ্লাইওভার বা মেট্রোরেলের প্রকৃত সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। মেট্রোরেল যেমন ঢাকায় নারীদের জন্য আস্থার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, এই মডেলটি যদি সাধারণ বাস বা লেগুনার ক্ষেত্রেও বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই ঢাকার যাতায়াত ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
আমাদের প্রত্যাশা:
আপনার, আমার এবং রাজধানীর প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সজাগ দৃষ্টিই পারে বাসগুলোকে নিরাপদ করতে। বাসে কোনো অশোভন আচরণ দেখলে মুখ বুজে না থেকে প্রতিবাদী হওয়া এখন সময়ের দাবি। ঢাকা শুধু কংক্রিটের শহর নয়, ঢাকা হোক মায়ার শহর, নিরাপদ যাতায়াতের শহর। যেদিন মতিঝিল থেকে উত্তরা কিংবা মিরপুর থেকে সদরঘাট পর্যন্ত যাতায়াতে একজন নারীকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হবে না, সেদিনই আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারব আমাদের ঢাকা সত্যিই উন্নত হয়েছে।