
X
কে এম মোস্তাক আহম্মেদ
দিন যায়, মাস পেরিয়ে বছর আসে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর এসএসসি পরীক্ষা ঘিরে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে এক ধরনের প্রত্যাশা ও উৎকণ্ঠার মিশ্র অনুভূতি কাজ করে।
এ পরীক্ষা কেবল একটি একাডেমিক মূল্যায়ন নয়; বরং এটি অনেক পরিবারের কাছে ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে বহিষ্কার, অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের মানসিক চাপ- এসব বিষয় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর দিক তুলে ধরে।
এবার আসা যাক বহিষ্কারের প্রসঙ্গে। পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার একটি পুরোনো সমস্যা হলেও এটি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিজেদের অপ্রস্তুত মনে করে শর্টকাট পদ্ধতির দিকে ঝুঁকে পড়ে। আবার কোথাও কোথাও কেন্দ্রভিত্তিক অনিয়ম বা শিথিল নজরদারিও এর পেছনে ভূমিকা রাখে। বহিষ্কার শুধু একটি পরীক্ষার ফলাফলকে প্রভাবিত করে না; এটি একজন শিক্ষার্থীর আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাসের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, অনুপস্থিতির বিষয়টিও সমানভাবে উদ্বেগজনক। বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে না- কখনো শারীরিক অসুস্থতা, কখনো পারিবারিক সমস্যা, আবার কখনো মানসিক চাপে ভেঙে পড়া। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক শিক্ষার্থী অতিরিক্ত প্রত্যাশা ও ভয় থেকে পরীক্ষার দিনেই অসুস্থ হয়ে পড়ে বা পরীক্ষায় বসার সাহস হারিয়ে ফেলে। এ অনুপস্থিতি তাদের এক বছরের পরিশ্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং ভবিষ্যতের পথকেও জটিল করে তোলে।
পুরো পরিস্থিতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন অভিভাবকরা। সন্তানের সাফল্য তাদের স্বপ্ন, আর ব্যর্থতা তাদের জন্য এক গভীর মানসিক আঘাত। অনেক অভিভাবক অজান্তেই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করেন ভালো ফল অর্জনের জন্য নিরন্তর তাগিদ, অন্যের সন্তানের সঙ্গে তুলনা, কিংবা নিজের অপূর্ণ স্বপ্ন চাপিয়ে দেওয়া। ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে এবং পরীক্ষাকে ভয় পেতে শুরু করে। এই ভয়ই কখনো কখনো ভুল সিদ্ধান্ত বা অনুপস্থিতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে সমস্যার সমাধান অসম্ভব নয়। প্রথমত, শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা ও আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু ভালো ফল নয়, বরং সৎ প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করার মানসিকতা গড়ে তোলা জরুরি। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন এবং একটি সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করেন, তবে শিক্ষার্থীরা অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে।
অভিভাবকদের ক্ষেত্রেও সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। সন্তানকে বোঝাতে হবে, তার সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করতে হবে। উৎসাহ দেওয়া জরুরি; কিন্তু চাপ সৃষ্টি করা নয়। একটি ইতিবাচক ও সমর্থনমূলক পরিবেশ শিক্ষার্থীর মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায় এবং তাকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।
পরিশেষে বলা যায়, এসএসসি পরীক্ষায় বহিষ্কার, অনুপস্থিতি ও অভিভাবকের উদ্বেগ-এই তিনটি বিষয় আলাদা হলেও পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হলে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন-শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক এবং নীতিনির্ধারকদের সমন্বয়ে একটি সুস্থ, ন্যায়সঙ্গত ও সহানুভূতিশীল শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
শিক্ষা শুধু পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি মানবিক ও নৈতিক বিকাশের প্রক্রিয়া। এই উপলব্ধি যত দ্রুত আমরা অর্জন করতে পারব, তত দ্রুতই এই সমস্যাগুলো থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।
এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রতিবছরই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভর্তির দৌড়ঝাঁপ নতুন করে শুরু হয়। ভালো ফলাফল অর্জনের পরও অনেক শিক্ষার্থী পছন্দের কলেজে ভর্তি হতে না পেরে চরম হতাশার মুখে পড়ে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নামি কলেজগুলোর সীমিত আসন এবং অতিরিক্ত আবেদনকারীর চাপ এই বিড়ম্বনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
অনলাইন ভর্তি প্রক্রিয়া চালু থাকলেও প্রযুক্তিগত জটিলতা, সার্ভার ডাউন এবং ভুল তথ্য প্রদানের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সমস্যার সম্মুখীন হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, উচ্চ জিপিএ পেয়েও শিক্ষার্থীরা প্রথম তালিকায় স্থান পায় না। ফলে তাদের দ্বিতীয় বা তৃতীয় পর্যায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়, যা মানসিক চাপ বাড়ায়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, ভর্তি নীতিমালা জটিল হওয়ায় তারা সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কোন কলেজে আবেদন করলে বেশি সুযোগ থাকবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকেই ভুল পছন্দক্রম দিয়ে ফেলেন। অন্যদিকে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও উঠে আসে, যা সাধারণ পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা আরও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হয়। ইন্টারনেট সুবিধার অভাব এবং সঠিক দিকনির্দেশনার ঘাটতির কারণে তারা অনেক সময় আবেদন প্রক্রিয়াতেই পিছিয়ে পড়ে। ফলে মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা ভালো প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ হারায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, স্বচ্ছ এবং শিক্ষার্থী-বান্ধব করতে হবে। পাশাপাশি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। তা না হলে প্রতি বছরই এসএসসি-পরবর্তী ভর্তি নিয়ে এই বিড়ম্বনা চলতেই থাকবে।
লেখক: কেএম মোস্তাক আহম্মেদ, নির্বাহী সম্পাদক, শীর্ষ অর্থনীতি।