
X
সংগৃহীত ছবি
প্রতি বছর ৩ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। ১৯৯৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই দিবসকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়, যার মূল লক্ষ্য সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের অধিকার এবং তথ্যপ্রবাহের অবাধ পরিবেশ নিশ্চিত করার গুরুত্ব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।
একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কেবল সংবাদ পরিবেশনের যন্ত্র নয়; এটি রাষ্ট্রের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে, অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং জনগণের জানার অধিকারকে শক্তিশালী করে। গণতন্ত্রের চারটি মূল স্তম্ভের অন্যতম হিসেবে গণমাধ্যমকে বিবেচনা করা হয়, কারণ স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ছাড়া গণতন্ত্র কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
চলতি বছর বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) প্রকাশিত বৈশ্বিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা দিয়েছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম, যেখানে গত বছর ছিল ১৪৯তম। অর্থাৎ এক বছরে বাংলাদেশ তিন ধাপ পিছিয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান স্কোর ৩৩.০৫, যা গত বছরের ৩৩.৭১ থেকে কম। এই স্কোর বাংলাদেশকে ‘খুব গুরুতর’ বা অত্যন্ত উদ্বেগজনক শ্রেণিতে ফেলেছে। অর্থাৎ সাংবাদিকতা, তথ্যপ্রবাহ ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে নানা ধরনের কাঠামোগত, রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোর অবস্থানও খুব সন্তোষজনক নয়। ভারত ১৫৭তম এবং পাকিস্তান ১৫৩তম স্থানে রয়েছে। যদিও দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিকভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নানা চাপের মুখে, বাংলাদেশের ধারাবাহিক অবনতি বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ডিজিটাল অগ্রগতি ও সামাজিক পরিবর্তনের পাশাপাশি একটি রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক মর্যাদা অনেকাংশে নির্ভর করে সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা সুরক্ষিত তার ওপর।
আরএসএফ পাঁচটি সূচকের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করে—রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইনি কাঠামো, অর্থনৈতিক পরিবেশ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। এই পাঁচ ক্ষেত্রের যেকোনো একটিতে বড় ধরনের সংকট থাকলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক মেরুকরণ, আইনি সীমাবদ্ধতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট উদ্বেগ, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, পেশাগত চাপ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, মালিকানা কাঠামোর প্রভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হয়, যা জনগণের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তিকে সীমিত করে।
বিশ্বব্যাপী পরিস্থিতিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। আরএসএফ জানিয়েছে, গত ২৫ বছরের মধ্যে বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা বর্তমানে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি দেশ ‘কঠিন’ অথবা ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ অবস্থায় রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তা আইন, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধ, সংঘাত, রাজনৈতিক মেরুকরণ, করপোরেট প্রভাব, সাংবাদিক হত্যা, অনলাইন হয়রানি ও ভুয়া তথ্যের বিস্তার বিশ্বব্যাপী এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু গণতান্ত্রিক দেশেও সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ বেড়েছে।
এ বছর তালিকার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে, যার স্কোর ৯২.৭২। অন্যদিকে সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে ইরিত্রিয়া, যার স্কোর মাত্র ১০.২৪। এই পার্থক্য স্পষ্ট করে যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু আইনের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি, মানবাধিকার চর্চা, রাষ্ট্রীয় সহনশীলতা, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক মানসিকতার প্রতিফলন।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস কেবল একটি প্রতীকী দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা, মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সময়। কারণ স্বাধীন গণমাধ্যম ছাড়া দুর্নীতি উন্মোচন, জনদুর্ভোগ তুলে ধরা, নীতিনির্ধারণী ভুল শনাক্ত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা কঠিন। যখন সংবাদমাধ্যম স্বাধীন থাকে না, তখন জনগণ প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়, গুজব বৃদ্ধি পায়, সামাজিক বিভ্রান্তি বাড়ে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা মানে দায়িত্বহীনতা নয়। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হলো তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ, নৈতিক ও জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতা। অপতথ্য, গুজব, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ বা ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর উপস্থাপন গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন করে। ফলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব যেমন স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, তেমনি গণমাধ্যমের দায়িত্ব সত্যনিষ্ঠতা, পেশাগত নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বজায় রাখা।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে গণমাধ্যমের চরিত্র দ্রুত বদলেছে। অনলাইন সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউবভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ ও নাগরিক সাংবাদিকতা তথ্যের বিস্তারকে সহজ করেছে। এখন যে কেউ দ্রুত তথ্য প্রকাশ করতে পারে। এটি যেমন গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ বাড়িয়েছে, তেমনি ভুয়া খবর, বিভ্রান্তি, সাইবার বুলিং, ট্রল সংস্কৃতি, অনলাইন হুমকি ও তথ্য সন্ত্রাসও বাড়িয়েছে। ফলে আজকের বিশ্বে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, মিডিয়া লিটারেসি ও ডিজিটাল নৈতিকতা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে বহু তরুণ সাংবাদিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, মানবিক গল্প, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে কাজ বাড়ছে। কিন্তু সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, পেশাগত স্থিতিশীলতা, ন্যায্য মজুরি, আইনি সুরক্ষা এবং স্বাধীন অনুসন্ধানের পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভয়ভীতি বা অযৌক্তিক চাপ শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি নয়; এটি পুরো সমাজের তথ্য অধিকারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সত্য প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করা মানে জনগণের অধিকার রক্ষা করা। একটি রাষ্ট্র যত বেশি সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে, তত বেশি সে শক্তিশালী হয়। কারণ গঠনমূলক সমালোচনা রাষ্ট্রবিরোধী নয়; বরং উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের সহায়ক।
বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাংবাদিকরা ভয় নয়, দায়িত্ব নিয়ে কাজ করবেন; গণমাধ্যম হবে স্বাধীন কিন্তু নৈতিক; রাষ্ট্র হবে শক্তিশালী কিন্তু সহনশীল; এবং নাগরিকরা পাবে সত্য জানার পূর্ণ অধিকার।
এক্ষেত্রে প্রয়োজন কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ; সাংবাদিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সংবাদমাধ্যমবান্ধব নীতিমালা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য এবং ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি।
আজকের দিনে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত মুক্ত গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগঠনের অংশীদার হিসেবে দেখা। কারণ সত্যকে দমন করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে তা নির্মূল করা যায় না। স্বাধীন গণমাধ্যমই পারে অন্ধকারে আলো ফেলতে, অন্যায় উন্মোচন করতে, দুর্নীতির মুখোশ খুলে দিতে এবং জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে প্রত্যাশা বাংলাদেশে এমন এক বাস্তবতা গড়ে উঠুক, যেখানে সাংবাদিকতার পেশা হবে নিরাপদ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হবে সুরক্ষিত, তথ্যপ্রবাহ হবে উন্মুক্ত এবং গণতন্ত্র হবে আরও শক্তিশালী। মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের দাবি নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের জানার অধিকার, রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার ভিত্তি এবং একটি সভ্য, মানবিক ও গণতান্ত্রিক সমাজের অপরিহার্য শর্ত।
সত্য, স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে শক্তিশালী গণমাধ্যম; আর শক্তিশালী গণমাধ্যমই পারে একটি জাতিকে আলোকিত, সচেতন ও মর্যাদাবান করে তুলতে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
ডা. মুহাম্মদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান : জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি।