
X
ফাইল ছবি
গণমাধ্যমকে বলা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগের পরেই গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তবে এই অধিকার যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে, যা অনেক সময় মুক্ত সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতার সুযোগ তৈরি করে। মুক্ত গণমাধ্যম বলতে এমন এক পরিবেশকে বোঝায় যেখানে সাংবাদিক ও সংবাদ প্রতিষ্ঠানসমূহ কোনো রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক চাপ ছাড়াই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করতে পারে। মুক্ত গণমাধ্যম একটি দেশের জনমত গঠন, সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ওয়াচ ডগের ভূমিকা পালন করে।
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংবাদপত্র মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করেছে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাকস্বাধীনতার স্বীকৃতি মিললেও ১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামরিক শাসনামলে গণমাধ্যম কঠোর সেন্সরশিপের মুখে পড়ে। নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর দেশে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের যাত্রা শুরু হয়, যা গণমাধ্যমের বিস্তারে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এরপর বিংশ শতাব্দীর শেষে এবং একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ডিজিটাল বিপ্লব সংবাদপত্রের চিরাচরিত রূপ বদলে দেয়।
বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েক হাজার নিবন্ধিত সংবাদপত্র, কয়েক ডজন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এবং অসংখ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ সংবাদ মাধ্যমের উপস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে বহুত্ববাদ প্রকাশ করলেও গুণগত মানের ক্ষেত্রে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। একদিকে অবাধ তথ্যপ্রবাহ জনগণের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
গণমাধ্যমের কাঠামোগত বিকাশে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রযুক্তি। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিজেই সংবাদের একটি বড় উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারের সমান্তরালে পেশাদারিত্বের মান এবং সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়লেও সংবাদের গভীরতা বা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার কথা সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও, বাস্তবে একাধিক আইন ও প্রবিধান মুক্ত সাংবাদিকতার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলেছে। বিগত দশকগুলোতে বিশেষ করে 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন' এবং পরবর্তীতে 'সাইবার নিরাপত্তা আইন' নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এই আইনগুলোর অনেক ধারা অস্পষ্ট হওয়ায় এবং মানহানির সংজ্ঞাকে বিস্তৃত করায় সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করার বদলে এই আইনগুলো অনেক সময় অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া ঔপনিবেশিক আমলের 'অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট' এখনো তথ্য অধিকার আইনের পূর্ণ সুফল পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যম জগতের অন্যতম বড় সংকট রাজনৈতিক মেরুকরণ। অধিকাংশ বড় সংবাদ প্রতিষ্ঠানের মালিকানা সরাসরি রাজনৈতিক নেতা বা রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হাতে। ফলে সংবাদ মাধ্যমগুলো জনস্বার্থের চেয়ে মালিকপক্ষের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকে। যখনই ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, তখনই গণমাধ্যমগুলোর সুর বদলে যায়। এই দলীয় আনুগত্যের কারণে গণমাধ্যম তার নিরপেক্ষতা হারায় এবং সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়।
মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো সেলফ-সেন্সরশিপ। যখন একজন সাংবাদিক বা সম্পাদক বুঝতে পারেন যে নির্দিষ্ট কোনো খবর প্রকাশ করলে তার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হতে পারে বা তিনি ব্যক্তিগতভাবে হেনস্তার শিকার হতে পারেন, তখন তিনি নিজেই সংবাদটি এড়িয়ে যান। বর্তমানে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরাসরি সরকারি সেন্সরশিপের চেয়েও এই মানসিক চাপ সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতাকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনিয়ম বা দুর্নীতির খবরগুলো অনেক সময় মূলধারার গণমাধ্যমে স্থান পাচ্ছে না।
অনেক শিল্প গোষ্ঠী তাদের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য রক্ষা এবং নীতি-নির্ধারকদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার জন্য গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। যখন কোনো কর্পোরেট হাউস সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেলের মালিক হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকরা মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো সংবাদ পরিবেশন করতে পারেন না। এই কর্পোরেট নির্ভরশীলতা গণমাধ্যমকে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের বদলে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনী সংস্থায় রূপান্তরিত করছে।
আইনি ও রাজনৈতিক চাপের পাশাপাশি সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও একটি বড় ইস্যু। মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই সাংবাদিকরা স্থানীয় প্রভাবশালী বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের হামলার শিকার হন। এসব ঘটনার বিচারহীনতার সংস্কৃতি সাংবাদিকদের মনোবল ভেঙে দেয়। একই সাথে ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন না হওয়া এবং নিয়মিত বেতন না পাওয়ার ফলে সৃষ্টি হওয়া অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সংকট সাংবাদিকদের দুর্নীতির দিকে ধাবিত করে বা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য করে।
একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে আমূল বদলে দিয়েছে। বর্তমানে অনলাইন পোর্টাল এবং সোশ্যাল মিডিয়া সংবাদের দ্রুততম উৎস হিসেবে স্বীকৃত। এই ডিজিটাল রূপান্তর একদিকে তথ্যের গণতান্ত্রিকীকরণ ঘটিয়েছে, অন্যদিকে সংবাদপত্রের সামনে নিয়ে এসেছে নতুন আপদ। ইন্টারনেটের প্রসারের ফলে মূলধারার গণমাধ্যমের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে গেছে। এখন কমবেশি সবাই স্মার্টফোনের মাধ্যমে নাগরিক সাংবাদিকতায় অংশ নিচ্ছেন। তবে এই প্রতিযোগিতায় অনেক সময় সংবাদের সত্যতা যাচাই উপেক্ষিত হচ্ছে, যা হলুদ সাংবাদিকতাকে উসকে দিচ্ছে।
দেশের প্রেক্ষাপটে প্রকৃত মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করতে হলে কাঠামোগত সংস্কার অপরিহার্য। সাইবার বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো নিবর্তনমূলক আইনগুলোর অস্পষ্ট ধারাগুলো বাতিল বা সংশোধন করতে হবে, যাতে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে সত্য প্রকাশ করতে পারেন। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব সরকারের হাতে না রেখে একটি স্বায়ত্তশাসিত ও নিরপেক্ষ ‘মিডিয়া কমিশন’ গঠন করা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের জন্য সম্মানজনক বেতন কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে যাতে তারা কোনো লোভ বা চাপের কাছে নতি স্বীকার না করেন। গণমাধ্যমের মালিকানা প্রভাবশালী ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের হাতে সীমাবদ্ধ না রেখে পেশাদার সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার নীতিমালা তৈরি করতে হবে।
গণমাধ্যমের প্রকৃত শক্তি হলো জনগণের আস্থা। এই আস্থার জায়গাটি এক ধরনের ‘বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে’ ভুগছে। এই সংকট উত্তরণে সাংবাদিকদের নৈতিকতা ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)
লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট।