
X
মোহাম্মদ আলী-ফাইল ছবি
উত্তরজনপদের সীমান্তবর্তী জেলা ঠাকুরগাঁও। আয়তনে ছোট এই জেলার ঐতিহ্য প্রায় দু’শ বছরের। এখানে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির লোকজন একসাথে বসবাস করেন।
এই জেলার উত্তরে দেশের শেষ জেলা পঞ্চগড় এবং পূর্ব পাশে পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের একাংশ এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। ১৮০০ সালে ঠাকুরগাঁও নামে একটি থানা, ১৮৬০ সালে এটি মহকুমা এবং ১৯৮৪ সালে এটি ঠাকুরগাঁও জেলা হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
ঠাকুরগাঁও একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ জনপদ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে উন্নয়ন বঞ্চিত ছিল। সম্ভাবনাময়ী এই জেলার মানুষ অতি সহজ-সরল হিসেবে দেশে পরিচিত।
আরামপ্রিয় ও শান্তিপ্রিয় মানুষগুলো অন্যান্য জেলার উন্নয়নের তুলনায় বরাবরই বৈষম্যের শিকার হয়েছে। দেশের বার্ষিক রাজস্ব বাজেটে প্রতি বছরই উত্তরবঙ্গের সাথে বৈষম্য করা হয়। অন্যান্য বিভাগের তুলনায় মোটা বাজেটের সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেওয়া হয় উত্তরবঙ্গে।
বিগত দীর্ঘ সময়ে উত্তরাঞ্চল রাজনৈতিকভাবে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে অনেকাংশে পিছিয়ে ছিল। ফলে আঞ্চলিকভাবেই যেখানে দৈন্যাবস্থা সেখানে সীমান্ত ঘেষা উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থা আরো পিছিয়ে। কিন্তু সব ছাপিয়ে এই দৈন্যদশা থেকে বেরিয়ে আসছে ঠাকুরগাঁও।
বর্তমান সরকারী দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বাড়ি এই জেলায়। তিনি এখন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। তাঁকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবেও দেখার প্রত্যাশা অনেকের। ফলে এবার উন্নয়নের ছোঁয়া পেতে আশায় বুক বেধেছে এই জেলার মানুষ।
বর্তমান সরকার গঠনের তিন মাসেই উন্নয়নমূলক দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থাও ফিরেছে। ইতোপূর্বে রাজনৈতিক নেতারা নানা প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি আওড়ালেও বাস্তবে কিছুই পায়নি। কিন্তু বিগত নির্বাচনের আগে দেওয়া মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দেওয়া প্রতিশ্রুতি সল্প দিনেই বাস্তবায়ন দেখে নতুন করে তারা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিল্পায়ন, নাগরিক সেবাসহ নানা উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়েছে।
ফলে চায়ের দোকান থেকে কাচারী, গ্রাম থেকে শহর সবখানে আপামর জনগণের মাঝে আলোচনা, এবার কথা রেখেছেন মির্জা ফখরুল। প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাস্তবায়নেও এগিয়ে তিনি। তাঁর উন্নয়নমুলক কর্মকাণ্ডে সামাজিক যোাগাযাগ মাধ্যমে প্রশংসায় ভাসছেন তিনি।
সরকার গঠনের পরপরই ঠাকুরগাঁওয়ে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের এই দাবিটি দীর্ঘদিনের। কারণ, চিকিৎসার অধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল তারা। জেলা পর্যায়ে একটি হাসপাতাল রয়েছে। কিন্তু চিকিৎসা সেবা সন্তোষজনক নয়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নাই বললেই চলে।
শুক্রবার করে রংপুর ও ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ঠাকুরগাঁওয়ে আসেন। যেসব রুগী তারা দেখেন ফলোআপ করতে হলেও তাদের দেখাতে হলে রংপুর কিংবা ঢাকায় যেতে হয়। পরে প্রতিদিন গড়ে দুই শতাধিক রুগীকে চিকিৎসার জন্য রংপুর কিংবা ঢাকায় যেতে হয়। এটি এই এলাকার মানুষের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য। সম্প্রতি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করায় মানুষের মাধ্যে স্বস্থি ফিরেছে। প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে ঠাকুরগাঁও নার্সিং ইনস্টিটিউট।
দীর্ঘ আন্দোলনের ফসল ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম দ্রুত শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রতিথযশা শিক্ষাবীদকে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়েছে। তিনিও আগামী ২০২৬-২৭ সেশন থেকে শিক্ষার্থী ভর্তির মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম চালু হওয়ায় এই এলাকায় উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে নতুন এক দিগন্তের যাত্রা শুরু হতে চলেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার সারাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে।
ঠাকুরগাঁওয়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ঢাকার সাথে একমাত্র ট্রেন যোগাযোগ ভালো। সড়ক পথে রংপুর পর্যন্ত এখনো উন্নয়নের ছোঁয়া নেই। রংপুর-ঢাকা মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নয়ন হয়েছে। কিন্তু এটি ঠাকুরগাঁও পর্যন্ত বর্ধিতকরণ করা হয়নি। এই এলাকার কৃষিশিল্পের বিকাশ ঘটাতে অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম ঢাকা-ঠাকুরগাঁও মহাসড়ক নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখনো পাকা করা হয়নি। ঠাকুগাঁওয়ের গ্রমাঞ্চলের চলাচল করলেই মনে হবে ঠাকুরগাঁও কী পরিমাণে উন্নয়ন বঞ্চিত হয়েছে। এমন অনেক কাঁচা সড়ক আছে; যেসব সড়ক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গাড়ী ঝুকি নিয়ে চলাচল করে।
আকাশ পথে যোগাযোগের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ে একটি বিমানবন্দর থাকলেও এটি ছিল অকার্যকর। বিমানবন্দরটি চালু করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে এই এলাকার কৃষি ও অন্যান্য শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা খুব সহজেই চলাচল করতে পারবেন। বিমানবন্দর চালুর মাধ্যমে এই এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটবে।
এই অঞ্চলের মাটি ও পরিবেশ কৃষির জন্য অত্যন্ত উর্বর এবং উপযুগী। সব ধরণের চাষাবাদ খুব ভালো হয়। এরমধ্যে ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, শাক-সবজি, সরিষা, চিনা বাদাম, পেয়াঁজ, রসুন, মরিচ, আদা, হলুদ ও বিভিন্ন ধরণের সব্জি উল্লেখযোগ্য হারে উৎপাদন হয়ে থাকে। কিন্তু কৃষিজাত পণ্য রপ্তানীজাত করণের ভালো কোনো উদ্যোগ নেই।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হলে এবং কৃষিজাত পণ্য রপ্তানী প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা হলে কৃষিশিল্পের প্রসার ঘটবে। এই এলাকায় সুস্বাদু আম ও লিচু উৎপাদন হলেও রপ্তানী কিংবা প্রচার-প্রসারে এখনো পিছিয়ে রয়েছে। এই জেলায় চায়ের চাষ একটি সম্ভাবনময় যাত্রা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে অন্তত ৫০০ একর জমিতে চা চাষ শুরু হয়েছে। দিনদিন বাড়ছে।
এসব ফলফলাদি ও কৃষি পণ্য রপ্তানী প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা করা হলে দেশ-বিদেশে চাহিদা বাড়বে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবেন। কৃষিতে আরো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠবেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে বিসিক শিল্পনগরী-২ এর আওতায় ৫০ একর জায়গা নিয়ে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে যে প্রকল্পটি শুরু হয়েছে সেটি বাস্তবায়িত হলে অন্তত ২৫ হাজার লোকের কর্মসস্থান হবে। উৎপাদিত খাদ্যজাত দ্রব্য দেশ-বিদেশে রপ্তানীর সুযোগ হবে।
ঠাকুরগাঁওয়ে ২৮টির মতো নদী রয়েছে। এরমধ্যে টাঙ্গন, কুলিক, শুক, নাগর, তীরনই ও ভুল্লি অন্যতম। বেশিরভাগ নদীই খননের অভাবে বা অবৈধ দখলে বিলুপ্ত হতে চলেছে। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী খাল-নদী পুন:খননের যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন; এর অংশ হিসেবে ঠাকুরগাঁওয়ের নদীগুলো পুন:খনন ও অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে রক্ষা করা প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁতশিল্প বেশ ঐতিহ্যবাহী।
নানা সংকটের কারণে এই শিল্প হারিয়ে যেতে বসেছে। তাঁতীদের প্রশিক্ষণসহ তাঁতশিল্পের বিদ্যমান সংকট সমাধান করা হলে এই শিল্পের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁওকে সারাবিশ্বে ব্রান্ডিং করা সম্ভব। বিপুল সংখ্যক জনবল এই শিল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হতে পারবেন।
এই অঞ্চল লোকশিল্প সমৃদ্ধ জনপদ। ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প, তাঁতশিল্প, বাঁশ-বেত, সূচিকর্মের (নকশিকাঁথা) বিকাশ এই অঞ্চলের লোকশিল্পকে সাবলম্বী করেছে। সরকারী সহযোগিতা পেলে এই শিল্প হতে পারে বিশ্বের অনন্য শিল্প।
বর্তমান তথ্য-প্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক প্রযুক্তির কল্যাণে পুরো পৃথিবী এখন হাতের মুঠোয়। প্রায় সকল ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিতে দক্ষ করতে ঠাকুরগাঁওয়ে একটি আইসিটি হাব স্থাপন করা প্রয়োজন।
এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে উন্নয়ন কাজে সম্পৃক্ত করা গেলে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কর্মদক্ষ হয়ে উঠবে। শুধু দেশে নয় বিশ্ব পরিমণ্ডলের সীমাহীন কর্মক্ষেত্রে সম্পৃক্ত হয়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে সক্ষম হবে। অপার সম্ভাবনাময় ঠাকুরগাঁও হয়ে উঠবে উন্নয়ন সমৃদ্ধ একটি মডেল জেলা।
লেখক :
অতিরিক্ত পরিচালক (জনসংযোগ)
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
মোবাইল : ০১৭১৮৭৭১১৪৭