সাংবাদিকতার সংকটকাল: ভাইরালের উল্লাসে সত্যের নির্বাসন

মো. আব্দাল মিয়া

মতামত

সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, পরাজিত করা যায় না।একসময় সংবাদ ছিল সমাজের আয়না, আর সাংবাদিক ছিলেন সেই আয়নার নির্মোহ

2026-06-01T15:07:45+00:00
2026-06-01T15:07:45+00:00
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬ ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
রবিবার ৯ আগস্ট ২০২৬
   
সাংবাদিকতার সংকটকাল: ভাইরালের উল্লাসে সত্যের নির্বাসন
মো. আব্দাল মিয়া
প্রকাশ: সোমবার, ১ জুন, ২০২৬, ৩:০৭ পিএম   (ভিজিট : ২৪৯)
বুলেটিন গ্রাফিক্স, ইনসেটে লেখক
X

বুলেটিন গ্রাফিক্স, ইনসেটে লেখক

"সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, পরাজিত করা যায় না।"

একসময় সংবাদ ছিল সমাজের আয়না, আর সাংবাদিক ছিলেন সেই আয়নার নির্মোহ প্রতিচ্ছবি। সংবাদপত্রের প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য ও প্রতিটি প্রতিবেদন মানুষের কাছে ছিল বিশ্বাস ও নির্ভরতার প্রতীক। রাষ্ট্র, সমাজ এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম ছিল সাংবাদিকতা।

কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণের এই সময়ে সাংবাদিকতা এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। সত্যের চেয়ে এখন দ্রুততা গুরুত্বপূর্ণ, তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা বেশি বিক্রি হয়, আর জনস্বার্থের চেয়ে অ্যালগরিদমের চাহিদাই যেন সংবাদ নির্ধারণ করছে।

বর্তমান বিশ্বে তথ্যের প্রবাহ অভূতপূর্ব। একটি ঘটনা ঘটার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু তথ্যের এই গতি যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে নতুন সংকটও। 

সংবাদমাধ্যমের সাফল্য এখন অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত হচ্ছে কত দ্রুত একটি খবর ভাইরাল হলো, কত মানুষ সেটি দেখল কিংবা কত ‘ক্লিক’ অর্জিত হলো—এসব পরিসংখ্যান দিয়ে। ফলে সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার চেয়ে জনপ্রিয়তা ও দর্শকসংখ্যা অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বাস্তবতা আজ আরও কঠিন। একটি দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য উদঘাটন করতে একজন সাংবাদিককে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হয়। 

তথ্য সংগ্রহ, নথি যাচাই, সাক্ষাৎকার গ্রহণ এবং আইনি জটিলতা মোকাবিলা করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করতে মাসের পর মাস লেগে যায়। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর পোস্ট, বিকৃত ছবি কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই করা সংবাদ নয়, বরং আবেগনির্ভর ও চটকদার তথ্য বেশি মনোযোগ পায়।

এই পরিস্থিতিতে ক্লিকবেইট সংস্কৃতি সাংবাদিকতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। "চাঞ্চল্যকর ঘটনা!", "অবিশ্বাস্য ভিডিও!", "দেখুন কী ঘটেছে"—এ ধরনের শিরোনাম এখন অনেক প্ল্যাটফর্মে নিয়মিত দেখা যায়। পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় সংবাদকে কখনো কখনো তথ্যভিত্তিক উপস্থাপনার পরিবর্তে বিনোদনের পণ্যে রূপান্তর করা হচ্ছে। ফলে সংবাদপাঠের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিশ্লেষণধর্মী ধারা থেকে সরে গিয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও আবেগনির্ভর ভোগে পরিণত হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসার সংবাদ প্রচারের কাঠামোকেও বদলে দিয়েছে। আগে সংবাদ প্রকাশের পূর্বে সম্পাদকীয় পর্যায়ে বহুস্তরীয় যাচাই-বাছাই করা হতো। তথ্যসূত্রের নির্ভরযোগ্যতা, ফ্যাক্ট-চেকিং এবং নীতিগত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে একটি সংবাদ প্রকাশ পেত। বর্তমানে সেই গেটকিপিং ব্যবস্থার অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে। 

স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে যে কেউ মুহূর্তেই তথ্য প্রচার করতে পারছে। যদিও এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে শক্তিশালী করেছে, তবে একই সঙ্গে গুজব, অপপ্রচার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তারও বহুগুণ বাড়িয়েছে।

বিশ্বজুড়ে তথ্যের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বিশেষজ্ঞরা "ইনফোডেমিক" হিসেবে চিহ্নিত করছেন। প্রতিদিন অসংখ্য যাচাইহীন তথ্য মানুষের সামনে আসছে। পুরোনো ছবি নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা, বক্তব্যের অংশবিশেষ কেটে ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন করা কিংবা অন্য দেশের ঘটনার ভিডিও স্থানীয় ঘটনা হিসেবে প্রচার করা এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এসব বিভ্রান্তিকর তথ্য শুধু মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে না, বরং সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনআস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই সংকটের সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছেন পেশাদার সাংবাদিকরা। সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সাংবাদিককে হুমকি, হয়রানি, মামলা এমনকি শারীরিক আক্রমণের শিকার হতে হয়। বিশেষ করে মফস্বল অঞ্চলের সাংবাদিকদের অনেকেই সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করেন। 

পর্যাপ্ত বেতন, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা নিরাপত্তা না থাকলেও তারা মানুষের সমস্যা, দুর্ভোগ ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

অন্যদিকে পাঠকের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ পড়ার আগ্রহ অনেকের মধ্যে কমে যাচ্ছে। দ্রুত তথ্য গ্রহণের প্রবণতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নির্ভর সংবাদপাঠ মানুষের মনোযোগের সময়সীমা সংকুচিত করেছে। ফলে গভীর অনুসন্ধান বা প্রেক্ষাপটভিত্তিক সংবাদ অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। এই বাস্তবতায় কিছু সংবাদমাধ্যমও টিকে থাকার তাগিদে জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট কেবল সংবাদমাধ্যমের সমস্যা নয়; এটি সমাজের সামগ্রিক নৈতিক ও গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জের প্রতিফলন। কারণ গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ এবং সচেতন নাগরিক সমাজ। যখন সংবাদমাধ্যম তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, তখন মানুষের পক্ষে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভ্রান্তি, গুজব এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি জনমত তখন বাস্তবতাকে আড়াল করে ফেলে।

তবুও আশার জায়গা রয়েছে। প্রযুক্তি যেমন ভুয়া তথ্য ছড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে, তেমনি ফ্যাক্ট-চেকিং, ডেটা জার্নালিজম এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নতুন দিগন্তও উন্মোচন করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকরা এখনও সত্য উদ্ঘাটনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করছেন। পাঠকদের মধ্যেও ধীরে ধীরে তথ্য যাচাইয়ের সচেতনতা বাড়ছে।

সত্য কখনোই সহজ পথের যাত্রী নয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, মিথ্যা সাময়িকভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকে সত্যই। তাই সাংবাদিকতার এই সংকটকালে প্রয়োজন দায়িত্বশীল সংবাদচর্চা, পেশাগত নৈতিকতার পুনর্জাগরণ এবং সচেতন পাঠকসমাজের সক্রিয় ভূমিকা। কারণ সাংবাদিকতা যদি সত্যের পথ হারায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পেশা নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে সমাজ, গণতন্ত্র এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জানার অধিকার।

লেখক : প্রতিবেদক, বাংলাদেশ বুলেটিন, বানিয়াচং (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি।





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy