
X
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
বাংলাদেশের অপরাধ দমন ও বিচারিক ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) দুবাইয়ে ইন্টারপোলের রেড নোটিশের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজির আহমেদ। তাঁর বিরুদ্ধে দেশে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, জালিয়াতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো একাধিক গুরুতর অপরাধের মামলা বিচারাধীন।
বাংলাদেশ সরকার এখন তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের মুখোমুখি করতে বদ্ধপরিকর। তবে এই উচ্চ-প্রোফাইল প্রত্যর্পণ (Extradition) প্রক্রিয়াটি কতটা মসৃণ হবে? আইনি মারপ্যাঁচ এবং কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই বিশেষ প্রতিবেদন।
কাউন্টডাউন শুরু: ৩০ দিনের ডেডলাইন
সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ এনসিবি (NCB) আবুধাবি থেকে গত ১২ জুন ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশের এনসিবি ঢাকাকে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছে, যার সত্যতা মিলেছে।
উক্ত অফিসিয়াল বার্তা অনুযায়ী, ইউএই-এর ‘Federal Law No. 39/2006’ (আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা আইন)-এর ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ সরকার বেনজির আহমেদকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণের আবেদন করার জন্য ঠিক ৩০ দিন সময় পাবে। এই সময়সীমার মধ্যে আবেদন না পৌঁছালে আইনি জটিলতায় আসামি হেফাজত থেকে মুক্তি পেয়ে যেতে পারেন। ফলে আগামী ১২ জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে ঢাকাকে নিখুঁত আইনি নথিপত্র পাঠাতে হবে।
প্রত্যর্পণের গুরুত্বপূর্ণ সময়রেখা (২০২৬)
• ১২ জুন: এনসিবি আবুধাবি কর্তৃক গ্রেপ্তারের অফিসিয়াল নিশ্চিতকরণ।
• ১২ জুলাই: কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন (Formal Request) জমা দেওয়ার শেষ সময়।
দ্বিপাক্ষিক চুক্তিহীনতা বনাম আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা
প্রথম নজরে মনে হতে পারে, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে কোনো কার্যকর দ্বিপাক্ষিক প্রত্যর্পণ চুক্তি (Extradition Treaty) না থাকায় এই প্রক্রিয়া থমকে যাবে। কিন্তু আইনের পথ এখানে রুদ্ধ নয়।
নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তি (২০১৪): ২০১৪ সালের অক্টোবরে দুই দেশের মধ্যে ‘Agreement on Security Cooperation’ স্বাক্ষরিত হয়, যা অপরাধীদের তথ্য আদান-প্রদান ও বিচারিক সহযোগিতার একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি তৈরি করেছে।
দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি স্থানান্তর চুক্তি (২০১৪): একই সময়ে স্বাক্ষরিত ‘Agreement on Transfer of Sentenced Prisoners’ চুক্তি অনুযায়ী, দণ্ডিত নাগরিকদের নিজ দেশে সাজা ভোগের সুযোগ রয়েছে (মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ব্যতীত)।
বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ আইন (১৯৭৪): ‘The Extradition Act, 1974’-এর ধারা ৪ অনুযায়ী, কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি না থাকলেও সরকার চাইলে পারস্পরিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অপরাধী আদান-প্রদান করতে পারে।
‘দুবাই মিশন’-এ সফল হতে হলে যা প্রয়োজন
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহুদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং ফাইলের শর্তাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই আইনি লড়াইয়ে জিততে হলে ঢাকাকে তিনটি মূল বিষয়ের ওপর জোর দিতে হবে।
১. নিখুঁত নথিপত্র ও আরবি অনুবাদ
ইউএই-এর আইন অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ আবেদনের প্রতিটি কাগজ (যেমন: আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এফআইআর, চার্জশিট, দুর্নীতির প্রমাণাদি) নিখুঁতভাবে আরবি ভাষায় অনুবাদ করতে হবে এবং বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সত্যায়িত হতে হবে।
২. দ্বৈত অপরাধের নীতি (Dual Criminality)
বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে যে, বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতি ও অর্থপাচারের অভিযোগগুলো শুধু বাংলাদেশের আইনেই নয়, বরং সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইনেও সমভাবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
৩. অ-রাজনৈতিক মামলার অকাট্য প্রমাণ
আন্তর্জাতিক আদালতে আসামিপক্ষ সাধারণত এ ধরনের মামলাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করে। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক দরবারে প্রমাণ করতে হবে যে, এই বিচার সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং দেশের প্রচলিত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অংশ।
বেনজির আহমেদের সফল প্রত্যর্পণ মূলত তিনটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে—নিখুঁত আইনি নথিপত্র, তথ্যের নির্ভুল উপস্থাপন এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক তৎপরতা।
অতীত অভিজ্ঞতা ও আশার আলো
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থাকা সত্ত্বেও অতীতে বাংলাদেশ অনেক পলাতক আসামিকে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আশার আলো দেখাচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, নরসিংদীর শিবপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. হারুনুর রশিদ খান হত্যা মামলার আসামি আরিফ সরকার ও মুহসীন মিয়াকে দুবাই পুলিশ ইন্টারপোলের সহায়তায় গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে বাংলাদেশ পুলিশ ও পিবিআইয়ের একটি বিশেষ টিম সফলভাবে তাদের দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয় (তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ৭ মে ২০২৬; প্রথম আলো, ১৫ জুন ২০২৬)।
শেষ কথা
বেনজির আহমেদের গ্রেপ্তার বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি বড় পরীক্ষা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পুলিশ সদর দপ্তরের সমন্বিত ও অতন্দ্র আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই কেবল এই উচ্চ-প্রোফাইল আসামিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সম্ভব। পুরো দেশ এখন তাকিয়ে আছে আগামী ৩০ দিনের কূটনৈতিক ও আইনি কৌশলের দিকে।
লেখক: কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও রাজনীতিবিদ। চেয়ারম্যান — বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র, চেয়ারম্যান — সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, চেয়ারম্যান — ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি), নির্বাহী পরিচালক — জিয়া ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি (জিয়া)