মার্কিন সাম্রাজ্যের সীমাবদ্ধতা ও ইরানের ‘সুপারপাওয়ার’ উত্থান

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

মতামত

বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে এত দ্রুত বদলে যেতে পারে, তা গত সাড়ে তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ না দেখলে বিশ্বাস

2026-06-17T15:10:54+00:00
2026-06-17T15:10:54+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ
মার্কিন সাম্রাজ্যের সীমাবদ্ধতা ও ইরানের ‘সুপারপাওয়ার’ উত্থান
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৩:১০ পিএম   (ভিজিট : ১১১)
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
X

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম

বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতি যে এত দ্রুত বদলে যেতে পারে, তা গত সাড়ে তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। চলমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট এবং ইরান-আমেরিকা-ইসরাইলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া সর্বশেষ পরিস্থিতি বিশ্ববাসীকে এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী করে তুলল। সম্প্রতি ইউরোপে অনুষ্ঠিত উন্নত অর্থনীতির সাত দেশের জোট জি-৭ (G-7) সম্মেলন এবং ফরাসি ভূখণ্ডে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংবাদ সম্মেলন সেই ঐতিহাসিক পরিবর্তনেরই আনুষ্ঠানিক সিলমোহর দিল।

আমি শুরু থেকেই এই যুদ্ধ ও এর নেপথ্যের কূটনীতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্পের শরীরী ভাষা (Body Language) এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর যে অসহায়ত্ব প্রকাশ পেয়েছে, তা এককথায় নজিরবিহীন। ট্রাম্পকে যখন প্রশ্ন করা হলো—ইরানের সাথে তিনি যে চুক্তি করতে যাচ্ছেন, তা ইসরাইল ও নেতানিয়াহু মেনে নেবে কি না? প্রশ্নটি শুনেই ট্রাম্পের চোখে-মুখে যে ক্ষোভ ও বিরক্তি ফুটে উঠেছিল, তা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি যেন হাজার মাইল দূর থেকেই নেতানিয়াহুকে চরম তিরস্কার করতে চাইছেন।

সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য হলো, ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেছেন—*"Without US there won't be no Israel"* (আমেরিকা ছাড়া ইসরাইল টিকে থাকতে পারত না)। এরপর আরও এক ধাপ এগিয়ে তিনি বলেন, *"Without me there won't be no Israel"* (আমাকে ছাড়া ইসরাইল টিকে থাকত না)। ট্রাম্পের এই আত্মস্বীকৃতির অর্থ অত্যন্ত পরিষ্কার—ইসরাইল নামক রাষ্ট্রটি সম্পূর্ণভাবে আমেরিকার কৃপা এবং সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল, যার নিজস্ব কোনো একক ক্ষমতা নেই এই অঞ্চলে টিকে থাকার। ট্রাম্পের দাবি, তিনি যদি ইরানের সাথে চুক্তি না করতেন, তবে ইরান এতদিনে ইসরাইলকে মানচিত্র থেকে মুছে দিত।

এই চুক্তির সমীকরণ নিয়ে এখন খোদ আমেরিকার অভ্যন্তরেই তোলপাড় চলছে। ইরানকে ৩০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার গুঞ্জন নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্পের ওপর রীতিমতো চড়াও হয়েছে। যদিও ট্রাম্প ক্যামেরার সামনে বারবার অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি ইরানকে কোনো টাকা দিচ্ছেন না। কিন্তু সত্য কি আর ঢাকা থাকে? ফক্স নিউজে যখন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিষয়ে চেপে ধরা হলো, তাঁর উত্তর ছিল চরম খোঁড়া। তিনি দাবি করলেন, চুক্তি তো আগেই (রবিবার) ডিজিটালি সই হয়ে গেছে, তাহলে নতুন করে টাকা দেওয়ার প্রশ্ন কেন আসবে!

অথচ তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডির বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং বাস্তবসম্মত। তিনি জানিয়েছেন, দক্ষিণ বৈরুতে ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান যখন চূড়ান্ত পাল্টা হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখন কাতারের অনুরোধে ইরান ট্রাম্পের সাথে আলোচনায় বসতে রাজি হয়। ইরান স্পষ্ট শর্ত দিয়েছিল—তাদের সব দাবি মানলেই কেবল হামলা থামবে। এবং ট্রাম্পকে ঠিক সেটাই করতে হয়েছে। অধ্যাপক মারান্ডি হেসে বলেছেন, ট্রাম্প বা ভ্যান্সের কথা এই পৃথিবীর কেউ বিশ্বাস করে না। ইরান শুধু এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারই পাচ্ছে না, বরং হরমুজ প্রণালি থেকেও বীমা, পরিবেশ বা নিরাপত্তার অজুহাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করবে। তাঁর ভাষায়: *"Israel has to accept that Iran is the superpower in this region, not Israel"* (ইসরাইলকে মেনে নিতেই হবে যে এই অঞ্চলের সুপারপাওয়ার ইরান, ইসরাইল নয়)।

আমেরিকার এই ঐতিহাসিক পরাজয় এবং পিছু হটার চিত্র সবচেয়ে ভালো ফুটে উঠেছে তাদেরই পরম মিত্র খোদ ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে। লন্ডনের বিখ্যাত 'টেলিগ্রাফ' পত্রিকা তাদের শিরোনামে প্রশ্ন তুলেছে—*"Thirteen thousand air strikes for what?"* (তাহলে এই তেরো হাজার বিমান হামলা কেন করা হলো?)। যুদ্ধ করে আমেরিকা কী পেল আর কী হারাল, সেই হিসাব মেলাতে পারছে না তারা। অন্যদিকে, বিশ্বখ্যাত 'বিবিসি'র শিরোনামটি ছিল আরও নির্মম ও সত্য—*"Iran deal ends Trump's war that revealed limit of US dominance"* (চুক্তির মাধ্যমে ট্রাম্পের যুদ্ধ শেষ হচ্ছে এবং তা আমেরিকার আধিপত্যের সীমাবদ্ধতাকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছে)। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোই আজ স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছে যে, আমেরিকার একক সাম্রাজ্যবাদের পতন এখান থেকেই শুরু।

যে ইসরাইলকে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যে তাদের অজেয় দুর্গ ভাবত, সেই ইসরাইল আজ খোদ আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছে এক চরম আপদ ও বোঝা হিসেবে গণ্য হচ্ছে। ট্রাম্প এখন আর নেতানিয়াহুর লেবানন নীতি পছন্দ করছেন না, তিনি প্রকাশ্যে বলছেন—*"He should stop it."* এই সুর পরিবর্তনের একমাত্র কারণ ‘ইরান-ভীতি’। আমেরিকা এখন খুব ভালো করেই জানে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা মারাত্মক। নেতানিয়াহু যদি নিজে থেকে না থামেন, তবে ইরানই যে তাকে থামিয়ে দেবে—এই ধ্রুব সত্যটি ট্রাম্পের জানা হয়ে গেছে। ব্রিটিশ ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক আলেকজান্ডারের মতে, এই যুদ্ধের চড়া মূল্য হিসেবে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারাতে যাচ্ছেন, আর ট্রাম্প নিজের দেশে ইতিহাসের অন্যতম অজনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

এই যুদ্ধের পর বৈশ্বিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গেছে। যুদ্ধের শুরুতে যারা ভেবেছিল ইরান ধ্বংস হয়ে যাবে, তারা আজ দেখছে এক পুনরুত্থিত ইরানকে। ইরানের ওপর থেকে ইউরোপ-আমেরিকার সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। তাদের পারমাণবিক প্রকল্প তাদের হাতেই অক্ষত থাকছে। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ইরান পৃথিবীর ৫ম ধনী দেশ। এত বছর নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে থাকা এই দেশটি এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উন্মুক্ত আকাশে ডানা মেলবে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি তারা খুব দ্রুত অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। আমেরিকার শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত অধ্যাপক পেপ-এর ভাষায় বলতে হয়: *"Iran will become a superpower in the world 18 months from now"* (আগামী ১৮ মাসের মাঝেই ইরান পৃথিবীতে সুপার পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হবে)।

ইতিহাসের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। যেখানে একটি যুদ্ধ একটি প্রাচীন সাম্রাজ্যের পতনের ঘণ্টা বাজিয়ে দিল এবং এক নতুন আঞ্চলিক পরাশক্তির জন্ম দিল। গত সাড়ে তিন মাস ধরে আমার কলামে আমি যে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের আভাস দিয়ে আসছিলাম, আজ তা বাস্তব সত্য হয়ে আমাদের চোখের সামনে ধরা দিল। ইতিহাস নির্মম, কিন্তু ইতিহাস সবসময়ই সত্যের পক্ষে কথা বলে।

লেখক: কলামিস্ট, সমাজসেবক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক, মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী। চেয়ারম্যান: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র, চেয়ারম্যান: সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট, চেয়ারম্যান: ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টার (ডিআরসি), নির্বাহী পরিচালক: জিয়া ইন্টারন্যাশনাল একাডেমি (জিয়া)





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy