
X
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
ভূ-রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে প্রায়শই যা দৃশ্যমান হয়, তার চেয়েও অনেক বেশি নাটকীয় ঘটনা ঘটে পর্দার আড়ালে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন, তেহরান, ইসলামাবাদ ও তেল আবিবের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক দাবার চাল চালানি হলো, তা বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন বাঁকের সূচনা করেছে। অনেকেই ভেবেছিলেন মার্কিন পরাশক্তি ও ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসনের মুখে ৫ হাজার বছরের প্রাচীন ইরানি সভ্যতা বুঝি গুঁড়িয়ে যাবে। কিন্তু দিনশেষে বাস্তবতা হলো, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আজ লেজ গুটিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি হেজিমোনি (একচ্ছত্র আধিপত্য) চরম ধাক্কা খেয়েছে।
এই পুরো সমীকরণটি আজ পরিষ্কার করেছেন ব্রাজিলের জগৎবিখ্যাত অনুসন্ধানী সাংবাদিক পেপে এস্কোবার। নরওয়ের অধ্যাপক এরিক গ্লেনের শো-তে তিনি যে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন, তা বিশ্ব গণমাধ্যমকে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এস্কোবার স্পষ্ট জানিয়েছেন, মার্কিন ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষক ল্যারি জনসন এবং তাঁর সাথে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের সরাসরি যোগাযোগ ছিল। অর্থাৎ, পর্দার আড়ালের সমঝোতার টেবিল বা ‘Negotiating Table’-এ তাঁদের সরাসরি অ্যাক্সেস ছিল।
পর্দার আড়ালের সেই ‘হুমকি’ ও ট্রাম্পের পিছুটান
পেপে এস্কোবারের তথ্যমতে, সপ্তাহ তিনেক আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফকে ফোন করে মূলত আমেরিকাকে একটি চরম বার্তা দিয়েছিলেন। পেজেশকিয়ান বলেছিলেন:
“Behave (America). If you keep overstepping, we're going to have to make a demonstration."
(আমেরিকাকে আচরণ ঠিক করতে হবে। তারা যদি বারবার সীমা লঙ্ঘন করে, তবে আমরা পরীক্ষা করে দেখিয়ে দেব।)
এই "Demonstration" বা প্রদর্শনীর অর্থ কী? এস্কোবারের ভাষায়—"No more nuclear ambiguity." অর্থাৎ, পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ইরান আর কোনো ধোঁয়াশা রাখবে না, সরাসরি পারমাণবিক পরীক্ষাটি (Nuclear Test) সম্পন্ন করে ফেলবে।
এই একটি মাত্র বার্তার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং মার্কিন প্রশাসনের টনক নড়ে। কারণ, ইরান যদি সত্যি সত্যি পারমাণবিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে ফেলে, তবে ট্রাম্প এবং রিপাবলিকান পার্টির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আমেরিকায় চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। যেখানে ওবামার ডেমোক্র্যাট প্রশাসন ‘JCPOA’ চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক বোমা বানানো থেকে বিরত রাখতে পেরেছিল, সেখানে ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে এসে সেই চুক্তি বাতিল করে বলেছিলেন ওবামা ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ চুক্তি করেছেন। আর এবার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প পর পর দুইবার ইরানের সাথে যুদ্ধ বাঁধিয়ে বসলেন। ফলে, ইরান যদি এখন পরমাণু পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তবে তার পুরো দায় চাপবে ট্রাম্পের ব্যর্থ নীতির ওপর।
আরাগচির পাকিস্তান সফর ও ইসরায়েলি উসকানি
এই ঘটনার তিন দিন পর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য ইসলামাবাদে যান। তিনি পাকিস্তানে অবস্থানকালেই ইসরায়েল দক্ষিণ বৈরুতে হামলা চালায়। পেপে এস্কোবার জানান, আরাগচি সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনকে বার্তা পাঠান—"আমেরিকানদের বলে দাও ওরা যদি এখনই ইসরায়েলকে না থামায়, আমরা এক্ষুনি ইসরায়েলে পাল্টা হামলা চালাব এবং পারমাণবিক পরীক্ষা করে আমেরিকাকে জবাব দেব।"
এর পরের দৃশ্যপট সবার জানা। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই জনসমক্ষে এসে বললেন, তিনি ইরানকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা ইসরায়েলে হামলা না করে। যে ট্রাম্প একসময় হুমকি দিয়েছিলেন পাঁচ ঘণ্টায় ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেবেন, সেই ট্রাম্পই এখন ইরানের সকল শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছেন। যুদ্ধ বা কৌশলগত লড়াইয়ে যারা জয়ী হয়, চুক্তির শর্ত তারাই লেখে। এই চুক্তির শর্তগুলোও লিখেছে তেহরান।
সাবধানী তেহরান ও মার্কিন দ্বিমুখী নীতি
তবে এই জয়ে কি ইরানিদের এখনই উৎসবে মেতে ওঠা উচিত? জাজ নেপোলিতানোর শো-তে এসে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মারান্ডি আজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন—"আমেরিকাকে বিশ্বাস করা যায় না।" সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা নিজেদের পরাজয় এত সহজে মেনে নেবে না।
বর্তমানে সিএনএন (CNN)-এর শিরোনাম হচ্ছে: "Trump's Iran agreement may be flawed, but he's getting what he wants" (ট্রাম্পের ইরান চুক্তি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু সে যা চায় তা-ই পাচ্ছে)। আসলে ট্রাম্প কী পাচ্ছেন? মার্কিন অর্থনীতি এই মুহূর্তে অত্যন্ত নাজুক, তেল-গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী। ট্রাম্প চেয়েছিলেন দ্রুত একটা চুক্তি করে অর্থনীতি সামাল দিতে, যাতে জরিপে তাঁর রেটিং কমে না যায়।
সাবেক মার্কিন কর্নেল ম্যাকগ্রেগর এবং পেপে এস্কোবার উভয়েই মনে করছেন, ট্রাম্প হয়তো আমেরিকার মিড-টার্ম (মধ্যবর্তী) নির্বাচন পর্যন্ত চুপ থাকবেন। সময় নেবেন। নির্বাচন পার হয়ে গেলে তিনি আবারও ইরানে হামলা করতে পারেন।
তাহলে ইরানের করণীয় কী? শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রবার্ট পেপ এর চমৎকার উত্তর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "June to December is a long time" (জুন থেকে ডিসেম্বর অনেক লম্বা সময়)। এই সাত মাস সময়ে ইরান চাইলে একাধিক পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলতে পারে। যারা যুদ্ধের ময়দানে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার হুমকি দিতে পারে, তাদের জন্য এটি কোনো কঠিন বিষয় নয়। অধ্যাপক পেপের মতে, আগামী ১৮ মাসের মাঝেই ইরান বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে।
ভবিষ্যদ্বাণী ও বর্তমান বাস্তবতা
আজকের এই পরিস্থিতি দেখে আমার সেই দিনটির কথা মনে পড়ছে, যেদিন ট্রাম্প হুংকার দিয়ে বলেছিলেন—"একটা সভ্যতা আজ ধ্বংস হতে যাচ্ছে।" বাংলাদেশের তথাকথিত অনেক ‘বিশিষ্ট’ বিশ্লেষক তখন টেলিভিশন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলাবলি করছিলেন, আমেরিকা বুঝি এবার ইরানে পারমাণবিক বোমা মেরেই দিল!
সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে গভীর রাতে আমি একটি পোস্ট লিখেছিলাম। আমি স্পষ্ট বলেছিলাম—ট্রাম্প জীবনেও ইরানে হামলা করবে না। ইরান কোনো ছোটখাটো দেশ নয়। আমি হিসাব করে দেখিয়েছিলাম কেন এই যুদ্ধ আমেরিকার পক্ষে জেতা অসম্ভব। তাছাড়া পশ্চিমা সাংবাদিকরা তখনো তেহরানে অবস্থান করছিলেন। লেখার শেষে বলেছিলাম—"চিন্তা করবেন না, কাল সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখবেন ইরান ঠিকই টিকে আছে।"
হ্যাঁ, ইরান শুধু সেদিন সকালেই নয়, আজও মাথা উঁচু করে টিকে আছে। পরাজিত হয়েছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। তবে মনে রাখতে হবে, একটি সাম্রাজ্যের যখন পতন শুরু হয়, তখন তার আচরণ আরও হিংস্র ও অসংলগ্ন হয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব হারানোর পর ট্রাম্প প্রশাসন এখন সম্ভবত ল্যাটিন আমেরিকার দিকে নজর দেবে। কিউবা এবং পরবর্তীতে ব্রাজিলে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের নতুন কোনো কূটকৌশল তারা শুরু করতে পারে। তবে আপাতত, ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত এই মহাযুদ্ধে তেহরান যে ওয়াশিংটনকে ‘চেকমেট’ করে দিয়েছে, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।
লেখক: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র; সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট এবং ডেমোক্রেসি রিসার্চ সেন্টারের (ডিআরসি) চেয়ারম্যান।