
X
গ্রাফিক্স বাংলাদেশ বুলেটিন (ইনসেটে লেখকের ছবি)
একজন নাগরিক পাসপোর্ট-এর জন্য জন্য পাসপোর্ট অফিসে যাচ্ছেন। সেখানে তাকে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হয়, যদিও সেই তথ্য সরকারের হাতে আগে থেকেই আছে। সেই নাগরিক এ যদি আবার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন তাহলে তাকে আবার সেই একি তথ্য দিতে হয়ে, এনআইডি এর ফটোকপি জমা দিতে হয়, কিছুদিন পর তিনি যখন সামাজিক সুরক্ষা ভাতার জন্য আবেদন করেন, তখন আবারও তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হয়, নতুন করে কাগজ জোগাড় করতে হয়, লাইনে দাঁড়াতে হয়।
একই মানুষ, একই তথ্য, কিন্তু সরকারের প্রতিটি দপ্তর তাকে যেন নতুন করে চেনে। এর চাইতেও কঠিন যখন তার এনআইডির তথ্য সংশোধন হয়, কিন্তু সেটা পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সে আপডেট করতে আবার ও তাকে সব তথ্য, ফটোকপি নিয়ে ঘুরতে হয়। এই দৃশ্য বাংলাদেশে অপরিচিত নয়। আর এর পেছনের কারণটি একটিমাত্র শব্দে বলা যায়— ইন্টারঅপারেবিলিটির অভাব।
বাংলাদেশ গত এক দশকে ডিজিটাল সরকারের পথে অনেকটাই এগিয়েছে, এই কথাটি অস্বীকার করার উপায় নেই। ২০২৪ সালে জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে দেশ উঠে এসেছে ১০০তম স্থানে, যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
দেশজুড়ে ৯ হাজারের বেশি ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র চালু হয়েছে, স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র পেয়েছেন ১০ কোটির বেশি মানুষ, আর প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয় এখন নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অ্যাপ চালাচ্ছে। কিন্তু এই অগ্রগতির নিচে একটা ফাঁক থেকেই গেছে, যা সরকার নিজেও অস্বীকার করছে না।
জাতীয় ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলপত্রের খসড়ায় স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে— দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডিজিটাল সম্পদের কারণে পিছিয়ে পড়েছে, এবং গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোর হাতে থাকা বড়ো বড়ো তথ্যভাণ্ডারের মধ্যে কোনো নিরাপদ সংযোগ নেই। সরকারের সাত শতাধিক অনলাইন সেবার একটিও পুরোপুরি প্রান্ত থেকে প্রান্ত ডিজিটাল নয়— কোথাও না কোথাও মানুষকে এখনো সশরীরে যেতে হয়, কাগজ জমা দিতে হয়, স্বাক্ষর করাতে হয়।
এর মূল্য নাগরিকরাই দিচ্ছেন। একই পরিচয়পত্র বারবার জমা দেওয়া, একটি ভাতা পাওয়ার আগে কর অফিসের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখার কোনো ব্যবস্থা না থাকা, জমি রেজিস্ট্রি অফিসের পক্ষে জরিপ বিভাগের রেকর্ড তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে না পারা, একটি সরকারি হাসপাতালের ডাক্তারের পক্ষে অন্য হাসপাতালে রোগীর আগের চিকিৎসার ইতিহাস জানার সুযোগ না থাকা— এই সবই একই সমস্যার বিভিন্ন রূপ।
প্রতিটি মন্ত্রণালয় যেন একটি করে দ্বীপ, আর নাগরিককেই সেই দ্বীপগুলোর মধ্যে সাঁকো হয়ে চলতে হয়। ডিজিটাইজেশন হয়েছে ঠিকই, কিন্তু একীকরণ হয়নি বললেই চলে— আর এই ফাঁকের বোঝা শেষ পর্যন্ত বহন করছেন সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মচারীরাই।
ইন্টারঅপারেবিলিটি আসলে কী?
সহজ ভাষায় বলা যায়, ইন্টারঅপারেবিলিটি হলো ভিন্ন ভিন্ন সরকারি সিস্টেমের নিজেদের মধ্যে কথা বলার এবং প্রয়োজনমতো তথ্য বিনিময় করার ক্ষমতা— নিরাপদভাবে, নিয়ম মেনে, আর প্রয়োজন অনুযায়ী। এর ফলে একটি মন্ত্রণালয়ে দেওয়া এনআইডি তথ্য অন্য মন্ত্রণালয়েও কাজে লাগে, নতুন করে জমা দিতে হয় না। একটি ব্যাবসা নিবন্ধনের আবেদন একই সঙ্গে কর, ট্রেড লাইসেন্স আর স্থানীয় সরকারের ছাড়পত্র— সবকিছু যাচাই করতে পারে।
ভাতাভোগীর তথ্য আয়কর বা চাকরির তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, ফলে ভুয়া ভাতাভোগী ধরা পড়ে সহজেই। আর একজন চিকিৎসক প্রয়োজনে অন্য হাসপাতাল থেকে রোগীর পুরোনো তথ্য দেখতে পান, রোগীকে নতুন করে সব বলার প্রয়োজন হয় না।
এই ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে তিনটি স্তম্ভের ওপর। প্রথমত, একই রকম তথ্য মানদণ্ড— যাতে দুটো ভিন্ন সিস্টেম একে অপরের পাঠানো তথ্য বুঝতে পারে। দ্বিতীয়ত, সুরক্ষিত এপিআই বা তথ্য বিনিময়ের গেটওয়ে, যার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিতভাবে তথ্য চলাচল করে। আর তৃতীয়ত— যা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত থাকে— একটি আইনি কাঠামো, যা ঠিক করে দেয় কোন তথ্য কার সঙ্গে, কোন শর্তে, আর কী সুরক্ষা মেনে শেয়ার করা যাবে।
কেন এটা নিয়ে এত কথা?
ইন্টারঅপারেবিলিটি থাকলে সবচেয়ে বড়ো যে পরিবর্তনটা আসে, তা হলো, নাগরিককে বারবার একই কাগজ জমা দিতে হয় না। “একবার জমা, সর্বত্র প্রযোজ্য।”
এইই নীতিতে একটি তথ্য একবার দিলেই বিভিন্ন দপ্তর তা প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে পারে। এতে সময় বাঁচে, ভুল কমে, আর কাগজের ফাইল বগলদাবা করে অফিসে অফিসে ঘোরার দিন শেষ হয়। যে ব্যাবসা নিবন্ধনে এখন একের পর এক দপ্তরে ঘুরতে হয়, তা একসঙ্গে, সমান্তরালভাবে হতে পারে। যে ভাতা আবেদন যাচাই করতে সপ্তাহ লাগে, তা মিনিটেই সম্ভব হতে পারে, যদি সিস্টেমগুলো একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে পারে।
দুর্নীতি ঠেকানোর জায়গা থেকেও এর গুরুত্ব কম নয়। বিচ্ছিন্ন সিস্টেমেই দুর্নীতির সুযোগ বেশি তৈরি হয়— একই ব্যক্তি দুই জায়গায় ভাতা তোলেন, বেতনের খাতায় নাম থাকে এমন কর্মচারীর, যার আসলে অস্তিত্বই নেই, জাল কাগজ কেউ ধরতে পারে না, কারণ যাচাই করার কোনো উপায় নেই। যখন তথ্য একটামাত্র নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে আসে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্রস-চেক হয়, তখন এই ফাঁকফোকরগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
নীতিনির্ধারণের জন্যও এটা জরুরি। একজন স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা সচিব যদি কেবল নিজের মন্ত্রণালয়ের তথ্য দেখেন, তার সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিন্তু স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ আর অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য একসঙ্গে দেখতে পারলে বোঝা যায় আসলে সাহায্য কোথায় পৌঁছানো উচিত, কোথায় ফাঁক আছে। আর এই পুরো প্রক্রিয়ার একটা মানবিক দিকও আছে— যে নাগরিক সরকারের কাছে সহজে, ভোগান্তি ছাড়া সেবা পান, তিনি সরকারের ওপর আস্থা রাখেন। এই আস্থা কোনো বক্তৃতায় তৈরি হয় না, তৈরি হয় বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে।
সরকার নিজেই ২০৩০ সালের মধ্যে একটি স্মার্ট, ডিজিটাল অর্থনীতির স্বপ্ন দেখছে— যেখানে থাকবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্ভর পূর্বাভাসভিত্তিক প্রশাসন, একটি জাতীয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা এবং একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচার। কিন্তু এই স্বপ্নগুলোর কোনোটাই সম্ভব নয় যদি মন্ত্রণালয়গুলোর সিস্টেম একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে না পারে। বিচ্ছিন্ন সিস্টেমের ওপর স্মার্ট সরকার গড়া যায় না, এটা কোনো প্রযুক্তিগত মতামত নয়, বাস্তবতা।
এস্তোনিয়া যা করে দেখিয়েছে
ইন্টারঅপারেবিলিটির কথা উঠলে সবার আগে যে দেশের নাম আসে, তা হলো এস্তোনিয়া। বাল্টিক সাগরের তীরের এই ছোট্ট দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ডিজিটাল রাষ্ট্র বলা হয়, আর এর পেছনে আছে একটিমাত্র প্রযুক্তি— এক্স-রোড। ২০০১ সালে চালু হওয়া এই উন্মুক্ত-উৎস তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একসূত্রে বেঁধেছে। কর জমা দেওয়া থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা, ব্যাবসা নিবন্ধন থেকে ভোট দেওয়া— সবকিছুর ভিত্তি এখন এই একটি ব্যবস্থা।
ফলাফলটাও চোখে পড়ার মতো। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ এস্তোনিয়া তার সরকারি সব সেবা শতভাগ ডিজিটাল করে ফেলেছে— বিশ্বে প্রথম কোনো দেশ যে এই জায়গায় পৌঁছাল। জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট সূচকে দেশটি ২০১৮ সালের ১৬তম স্থান থেকে উঠে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে, আর এই উল্লম্ফনের পেছনে সরাসরি কৃতিত্ব দেওয়া হয় এক্স-রোডকে। হিসাব বলছে, হাতে-কলমে তথ্য যাচাইয়ের ঝক্কি থেকে মুক্তি দিয়ে এই ব্যবস্থা প্রতি বছর দেশটির প্রায় ১,৩৪৫ কর্ম বর্ষ সাশ্রয় করছে। প্রতি মাসে এক্স-রোডের মধ্য দিয়ে প্রায় ৩০ কোটি তথ্য আদান-প্রদান হয়, যার মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ ঘটে সরাসরি নাগরিকের হাত দিয়ে— বাকিটা হয় এক সিস্টেম থেকে আরেক সিস্টেমে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে। ফিনল্যান্ড, জাপান, আইসল্যান্ডসহ ২৫টির বেশি দেশ ও অঞ্চল এখন এই একই মডেল ব্যবহার করছে। আর যা সবচেয়ে বিস্ময়ের— ২০০৭ সাল থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সাইবার হামলার শিকার দেশগুলোর একটি হয়েও, দুই দশকের বেশি সময়ে এক্স-রোডে বড়ো কোনো তথ্য লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি।
আসল প্রশ্ন হলো, এস্তোনিয়া কীভাবে এখানে পৌঁছাল? উত্তরটা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ২০০০ সালের শুরুর দিকে এস্তোনিয়ার অবস্থাও ছিল আজকের বাংলাদেশের মতোই— বিচ্ছিন্ন ডেটাবেস, ধীরগতির তথ্য বিনিময়, মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রণালয়ে দূরত্ব। তারা সব সিস্টেম আগে নিখুঁত করে তারপর সংযুক্ত করার অপেক্ষা করেনি। বরং আগে তথ্য বিনিময়ের রাস্তাটা বানিয়ে ফেলেছিল, আর সেই রাস্তাই বাকি আধুনিকীকরণকে টেনে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশও একই কাজ করতে পারে— হাতে থাকা স্মার্ট এনআইডি, ডি-নথি আর ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার-এর অবকাঠামোকে ভিত্তি ধরে।
ভারতের অভিজ্ঞতাঃ বিশাল দেশ, বিশাল পরীক্ষা -
এস্তোনিয়ার তুলনায় ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আরও কাছের এবং বাস্তবসম্মত, কারণ জনসংখ্যা, বৈচিত্র্য আর প্রশাসনিক জটিলতার দিক থেকে দুই দেশ একই ধাঁচের। ভারতের ইন্ডিয়া স্ট্যাক— আধার নামের ডিজিটাল পরিচয়, ইউপিআই নামের পেমেন্ট ব্যবস্থা আর ডিজিলকার নামের দলিল সংরক্ষণের প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে গড়া একটি উন্মুক্ত পরিকাঠামো— দেখিয়েছে, বড়ো, জটিল আর উন্নয়নশীল একটি দেশেও এই মডেল কাজ করে।
সংখ্যাগুলো নিজেই বলে দেয় গল্পটা। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১৩৮ কোটি আধার নম্বর ইস্যু হয়েছে, যা দেশের ৯৯ শতাংশের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে কভার করে— বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো বায়োমেট্রিক পরিচয় ব্যবস্থা এটি।
বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন বলছে, আঁধারের সঙ্গে যুক্ত আন্তঃক্রিয়াশীল ব্যবস্থার মাধ্যমে ভর্তুকির অপচয় ঠেকিয়ে আর প্রশাসনিক খরচ কমিয়ে ভারত বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বাঁচাচ্ছে। পরিচয় যাচাইয়ের খরচ, যা আগে ১০ থেকে ২০ ডলার লাগত, তা কমে এসেছে মাত্র ২৭ সেন্টে— ৯৭ শতাংশ সাশ্রয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত আধার দিয়ে প্রমাণীকরণের মোট লেনদেন ছাড়িয়ে গেছে ৯৪০০ কোটি, আর ২০টির বেশি সরকারি কল্যাণ কর্মসূচি এখন আঁধারের সঙ্গে যুক্ত, যা ভুয়া ভাতাভোগী কমাতে বড়ো ভূমিকা রেখেছে।
তবে ভারতের গল্পে শুধু সাফল্য নয়, সতর্কতার জায়গাও আছে। আধার চালুর প্রথম বছরগুলোয়, তথ্য সুরক্ষার আইন যথেষ্ট মজবুত ছিল না, যার ফলে গোপনীয়তা নিয়ে বিতর্ক আর কিছু ঘটনা মানুষের আস্থায় চোট দিয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে শেখার বিষয় হলো—ইন্টারঅপারেবিলিটির কাঠামো আর তথ্য সুরক্ষার আইন একসঙ্গে তৈরি করতে হবে, একটার পর একটা নয়। ভারতের মতো বিশাল আর জটিল একটি দেশ যদি এই মডেল সফলভাবে চালাতে পারে, তার পেছনে ছিল একটি মজবুত পরিচয় ব্যবস্থা, উন্মুক্ত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড আর একের পর এক সরকারের ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বাংলাদেশের হাতে স্মার্ট এনআইডি এরই মধ্যে আছে— বাকিটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা।
সিঙ্গাপুরের শিক্ষা : প্রযুক্তির চেয়েও প্রশাসন?
সিঙ্গাপুরের সিংহাসন ব্যবস্থা একটু ভিন্ন গল্প বলে। ছোট কিন্তু উচ্চ-সক্ষমতার এই রাষ্ট্রে, একটিমাত্র ডিজিটাল পরিচয় দিয়ে প্রায় ৫৯ লাখ নাগরিক ও অধিবাসী ৭০০-র বেশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ২ হাজারের বেশি সেবায় প্রবেশ করতে পারেন— একটাই লগইন আইডি দিয়ে।
কিন্তু সিঙ্গাপুরের আসল শিক্ষা প্রযুক্তিতে নয়, প্রশাসনে। এই ব্যবস্থা দেখিয়েছে, কেন্দ্রীভূত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থাও নাগরিকের আস্থা অর্জন করতে পারে, যদি তার সঙ্গে থাকে জোরালো তত্ত্বাবধান, স্বচ্ছতা আর স্পষ্ট নীতিমালা।
বাংলাদেশের জন্য এখান থেকে যা নেওয়ার আছে, তা কেবল প্রযুক্তি নয়— কোন তথ্য কার সঙ্গে আদান-প্রদান করা যাবে তার স্পষ্ট আইন, স্বাধীন তদারকি, নাগরিক নিজের তথ্য কোথায় কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে তা দেখার সুযোগ, আর অপব্যবহারের জন্য কঠোর জবাবদিহি। এগুলো বিলাসিতা নয়— এগুলোই আসলে পুরো কাঠামোর মজবুত ভিত।
বাংলাদেশের হাতে যা আছে—
বাংলাদেশ একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছে না, এটা মনে রাখা জরুরি। ১০ কোটির বেশি মানুষের স্মার্ট এনআইডি আছে, যা একটি মজবুত পরিচয়ের ভিত্তি হতে পারে। ডি-নথি প্ল্যাটফর্ম এখন অনেক মন্ত্রণালয়েই চিঠিপত্র আর ফাইল ব্যবস্থাপনার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। আইসিটি মন্ত্রণালয় এর হাতে আছে বছরের পর বছরের অভিজ্ঞতা আর প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ করার সম্পর্ক। বিসিসি এর মতো অবকাঠামো আছে, যা একটি জাতীয় “তথ্য বিনিময় স্তর” কে ধারণ করতে পারে। আর বাংলাদেশ জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচার (BNDA) নামের একটি কাঠামো এরই মধ্যে তৈরি হয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও পেয়েছে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ৯ হাজারের বেশি ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রের নেটওয়ার্ক, যা শেষ পর্যায়ে নাগরিকের কাছে সেবা পৌঁছানোর কাজটা করতে পারে।
সমস্যা হলো, এই টুকরোগুলো এখনো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত নয়। আর এই ফাঁকটা মূলত প্রযুক্তির নয়— প্রাতিষ্ঠানিক আর আইনি। বাংলাদেশের প্রয়োজন একটি নিরাপদ জাতীয় তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা, যা এস্তোনিয়ার এক্স-রোডের ধাঁচে কিন্তু বাংলাদেশের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে গড়া হবে। প্রয়োজন এমন একটি তথ্য সুরক্ষা আইন, যা স্পষ্ট করে বলে দেবে, কোন তথ্য কী শর্তে শেয়ার হবে আর নাগরিকের অধিকার কতটুকু।
প্রয়োজন একটি স্থায়ী আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সংস্থা, যার হাতে থাকবে সব মন্ত্রণালয়ে মানদণ্ড বাস্তবায়ন করার আসল ক্ষমতা। প্রয়োজন এমন এপিআই মানদণ্ড, যা মেনে চলা প্রতিটি নতুন সরকারি সিস্টেমের জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে, যাতে প্রথম দিন থেকেই একীকরণের কথা মাথায় রেখে সিস্টেম বানানো হয়। আর সবকিছু একসঙ্গে না করে, সামাজিক সুরক্ষা, জমি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য রেকর্ড আর ব্যাবসা নিবন্ধনের মতো কয়েকটা জায়গায় আগে পাইলট প্রকল্প চালানো দরকার, যা সফল হলে বাকি ব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরি করবে।
এখন কী করা উচিত?
এই পুরো আলোচনার ভিত্তিতে কয়েকটা কাজ অগ্রাধিকার দিয়ে করা যেতে পারে।
প্রথমত, বাংলাদেশ জাতীয় ডিজিটাল আর্কিটেকচার নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সব মন্ত্রণালয়ে বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে কোনো নতুন সরকারি ডিজিটাল প্রকল্প অনুমোদন বা অর্থায়ন পাওয়ার আগে এই মানদণ্ড মানতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয়ত, গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট - প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এই সম্পূর্ণ কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সকল মন্ত্রণালয় কে একটি সমন্বিত জাতীয় তথ্য বিনিময় প্লাটফর্মে নিয়ে আসার জন্য কাজ করতে পারে। এটিকে একটি সাধারণ আইটি প্রকল্প না ধরে, জাতীয় মহাসড়ক বা বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে দেখা উচিত, যার অগ্রগতি নিয়মিত জনসম্মুখে জানানো হবে।
তৃতীয়ত, তথ্য সুরক্ষা আইনটি প্রযুক্তিগত কাজের সঙ্গে সমান্তরালে পাস করতে হবে, কারণ ভারতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে পলিসিগত সমস্যার জন্য কী কী সমস্যা হতে পারে।
চতুর্থত, একসঙ্গে সবকিছু বদলে ফেলার চেষ্টা না করে তিনটি উচ্চ-প্রভাবসম্পন্ন সেক্টর বেছে নিয়ে সেখানে পূর্ণ ইন্টারঅপারেবিলিটি বাস্তবায়ন করা উচিত, আর তা ১৮ মাসের মধ্যে দৃশ্যমান করা উচিত।
আর পঞ্চমত, এই পুরো কাঠামো তৈরির প্রক্রিয়ায় বেসরকারি খাত, বিশ্ববিদ্যালয় আর নাগরিক সমাজের মতামত নেওয়া উচিত— কারণ বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর কৌশলপত্র (Bangladesh's digital transformation roadmap-draft) নিয়ে ইতোমধ্যেই সমালোচনা আছে যে এখানে সবার মতামত যথেষ্ট নেওয়া হয়নি, আর এই ভুল বারবার করলে ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তৈরি হবে না।
শেষ কথা
বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে সে বড়ো পরিসরে ডিজিটাল অবকাঠামো গড়তে পারে। স্মার্ট এনআইডি, ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র, আর জাতিসংঘের সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি— এসব সত্যিকারের অর্জন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এটা গল্পের প্রথম ভাগ মাত্র— ডিজিটাইজেশন হয়েছে, একীকরণ হয়নি।
দ্বিতীয় এবং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো : যা তৈরি হয়েছে, তা একসঙ্গে জোড়া লাগানো, সিস্টেমগুলোকে একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে শেখানো, আর সরকারকে বিচ্ছিন্ন কিছু দপ্তরের সমষ্টি না রেখে এমন একটি প্রতিষ্ঠান বানানো, যে প্রতিষ্ঠান সমস্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয় করতে পারবে। এস্তোনিয়া এটা করেছে এক্স-রোড দিয়ে। ভারত করেছে ইন্ডিয়া স্ট্যাক দিয়ে। বাংলাদেশকেও এটা করতে হবে, নইলে স্মার্ট বাংলাদেশের অথবা ডিজিটাল সার্ভিসের স্বপ্ন কেবল কাগজেই থেকে যাবে।
এই খণ্ডিত অবস্থা চালিয়ে যাওয়ার দামটা মোটেও বিমূর্ত কিছু নয়। এই দাম মেটাচ্ছেন সেই মানুষটি, যিনি সরকারের কাছে আগে থেকেই থাকা কাগজ আবার জমা দিতে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। এই দাম মেটাচ্ছে রাষ্ট্র, যখন তার ভর্তুকির টাকা পৌঁছে যায় এমন কারও কাছে, যার আসলে সেই টাকা পাওয়ার কথাই নয়। এই দাম দেখা যায় অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নেওয়া নীতিতে, আর সেবার দুর্বলতায় ক্ষয়ে যাওয়া মানুষের আস্থায়।
ইন্টারঅপারেবিলিটি কোনো কারিগরি খুঁটিনাটি বিষয় নয়। এটাই একটি আধুনিক, কার্যকর রাষ্ট্রের আসল সংযোগ-কাঠামো। বাংলাদেশের হাতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা আছে, প্রযুক্তিগত ভিত্তি আছে, আর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগও আছে। এখন প্রয়োজন কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস আর তা বাস্তবায়নের গতি। এই সুযোগের জানালাটা এখন খোলা— এটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আগেই কাজ শুরু করা উচিত।
তথ্যসূত্র : e-Estonia (2024), LightCastle Partners (2025), LightCastle Partners/ADB (2025), The Daily Star (2025), The Business Standard (2025), Chandler Governance Institute (2023), World Bank Group; Nortal (2024), Estonia E-Governance Academy (2024), Bangladesh Computer Council (2019)।
লেখক : টেকনোলজি কনসাল্ট্যান্ট, ইন-গভর্নেন্স অ্যান্ড ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন