আমন ধানে খাদ্যনিরাপত্তা: জলবায়ু সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল

ড. মো. আনোয়ার হোসেন

মতামত

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি এখনও ধান ও চালকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ধানের যেকোনো একটি মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে

2026-07-14T17:42:15+00:00
2026-07-14T17:42:15+00:00
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬ ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার ১০ আগস্ট ২০২৬
   
আমন ধানে খাদ্যনিরাপত্তা: জলবায়ু সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর কৌশল
ড. মো. আনোয়ার হোসেন
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৫:৪২ পিএম   (ভিজিট : ১৩২)
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভিত্তি এখনও ধান ও চালকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। ধানের যেকোনো একটি মৌসুমে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব শুধু কৃষি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জাতীয় অর্থনীতি, খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।

আমাদের দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত বোরো ধান সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়, কারণ দেশের মোট উৎপাদনের বড় অংশই আসে এ মৌসুম থেকে। তবে কৃষি অর্থনীতির গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়, আমন ধানই দেশের খাদ্যব্যবস্থা, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং কৃষকের জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বর্ষানির্ভর এই আমন মৌসুমে উৎপাদন ভালো হলে শুধু বাজারে চালের সরবরাহই বাড়ে না; একই সঙ্গে আগের মৌসুমের উৎপাদন ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ হয়, কৃষকের আয় স্থিতিশীল থাকে এবং সরকারি খাদ্য মজুত ও বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর চাপও কমে। 

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে ১.৭৩ কোটি টন আমন ধান উৎপাদিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.১১ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমনের আবাদি এলাকা বেড়ে ৫৭.৩৬ লাখ হেক্টরে পৌঁছেছে। দেশের মোট বার্ষিক ধান উৎপাদনের প্রায় ৪০ শতাংশ আসে আমন মৌসুম থেকে, যা জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তায় এ ফসলের কৌশলগত গুরুত্বকে সুস্পষ্ট করে।

তবে অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, বন্যা, বিলম্বিত রোপণ, রোগবালাই কিংবা কৃষি উপকরণের সংকটের মতো প্রতিকূলতা দেখা দিলে আমন উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুমের বৈশিষ্ট্যে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে। এ বাস্তবতায় কেবল রেকর্ড উৎপাদন উদযাপন করাই যথেষ্ট নয়; বরং জলবায়ু-সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ, উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর ফসল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদারের মাধ্যমে আগামী আমন মৌসুমকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, উৎপাদনমুখী ও ঝুঁকি-সহনশীল করে গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। আমন ধানকে দীর্ঘদিন ধরে অনেকটা ‘নীরব শক্তি’ হিসেবেই দেখা হয়েছে। কৃষি অর্থনীতির বাস্তব চিত্র বলছে, দেশের খাদ্যব্যবস্থাকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে আমনের অবদান কোনো অংশেই কম নয়। বিবিএস-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত প্রায় ৪.১৩ কোটি টন ধানের মধ্যে ১.৭৩ কোটি টন এসেছে আমন মৌসুম থেকে। অর্থাৎ, দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় দুই-পঞ্চমাংশ এসেছে এই এক মৌসুম থেকেই।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমন মৌসুমের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর বিস্তৃত ভৌগোলিক উপস্থিতি। দেশের প্রায় সব কৃষি-পরিবেশ অঞ্চলে আমন চাষ হয়ে থাকে। ফলে কোনো একটি অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলেও অন্য অঞ্চলের উৎপাদন দিয়ে ক্ষতি অনেকাংশে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। এ কারণেই জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে আমন শুধু একটি ফসল নয়; এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও একটি কার্যকর মাধ্যম। আমন ধানের অন্যতম বড় সুবিধা হলো, এটি প্রধানত বৃষ্টিনির্ভর ফসল হওয়ায় সেচের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে বোরো মৌসুমের মতো ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, বিদ্যুৎ বা ডিজেলচালিত সেচের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীল হতে হয় না। এতে একদিকে কৃষকের সেচ ব্যয় কমে, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপও হ্রাস পায়। তবে ধান গবেষকদের মতে, আমন চাষের প্রতিটি ধাপই আবহাওয়ার সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, কুশি গঠন, থোড় আসা থেকে শুরু করে শীষ বের হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে সঠিক সময়ে উপযুক্ত পরিমাণ বৃষ্টিপাত এবং জমিতে পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের ভারসাম্য বজায় থাকা জরুরি। বর্ষা মৌসুমে মূলত তিন ধরনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার প্রথমটি হলো আকস্মিক বন্যা বা অতিবৃষ্টি, যা বীজতলা ও সদ্য রোপণ করা চারা নষ্ট করে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় এবং ফসল বিলম্বিত করে। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘদিন জমিতে পানি জমে থাকলে গাছের শিকড় পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না, কুশি গঠন ব্যাহত হয় এবং সারের কার্যকারিতাও কমে যায়। তৃতীয়ত, অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও মেঘাচ্ছন্ন আবহাওয়া ব্লাস্ট, শীথ ব্লাইট, বাদামি গাছফড়িং এবং পাতা মোড়ানো পোকার প্রকোপ বাড়িয়ে দেয়।

২০২৫–২৬ অর্থবছরের আমন মৌসুমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল উন্নত ধানের জাতের চাষে কৃষকদের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ। এ মৌসুমে উচ্চফলনশীল আমনের আবাদ ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৬.৫০ লাখ হেক্টরে উন্নীত হয়েছে। একই সময়ে হাইব্রিড আমনের আবাদ ৫ শতাংশ বেড়ে ৩.৬২ লাখ হেক্টরে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, তুলনামূলক কম ফলনশীল স্থানীয় জাত এবং ছিটা আমনের আবাদ হ্রাস পেয়েছে। অধিক ফলন, উন্নত রোগসহনশীলতা এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে এই পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে আমন ধানের উৎপাদনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। BRRI বর্তমানে ১৯টি গবেষণা বিভাগ, ১৭টি আঞ্চলিক স্টেশন ও ৬টি স্যাটেলাইট স্টেশন নিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি উন্নত ধানের জাত, গবেষণালব্ধ তথ্য এবং ডিজিটাল কৃষি সেবাকে একই প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত করেছে। এর অন্যতম উদাহরণ স্মার্ট রাইস প্রোফাইল সিস্টেম এবং বাংলার ধান ইনফো, যেখানে বিভিন্ন ধানের জাতের ফলনক্ষমতা, মৌসুমভিত্তিক উপযোগিতা ও দানার গুণগত বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকে। এ ছাড়া বিআরআরআই-এর সিড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, রাইস সলিউশনস এবং রিসার্চ রিপোজিটরি ডেটাব্যাংক ধান উৎপাদন ব্যবস্থাপনাকে আরও তথ্যনির্ভর ও আধুনিক করে তুলছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিআরআরআই ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী একাধিক আমন ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। যেমন, জলমগ্ন ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকার জন্য ব্রি ধান৫১, ব্রি ধান৫২ ও ব্রি ধান১১০; জোয়ার-ভাটা প্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য ব্রি ধান৭৬ ও ব্রি ধান৭৭; লবণাক্ত এলাকার জন্য ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৪ ও ব্রি ধান৭৩ এবং খরাপ্রবণ অঞ্চলের জন্য ব্রি ধান৫৬, ব্রি ধান৫৭ ও ব্রি ধান৬৬ কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বাজারের জন্য ব্রি ধান৩৪, ৩৭ ও ৭০ এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান৬২ ও ব্রি ধান৭২ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আমন মৌসুমে বড় ক্ষতি ঠেকাতে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো দ্রুত ও নির্ভুল ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়ন। স্যাটেলাইট ভিত্তিক কৃষি পর্যবেক্ষণ, রিমোট সেন্সিং, মাঠতথ্য ও ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থাকে সমন্বয় করে বন্যা বা অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত আমন এলাকার দ্রুত মানচিত্র তৈরি করা সম্ভব। ক্ষতি হয়ে যাওয়ার পরপরই করণীয় নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে বীজতলা ও চারা ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যার জন্য উঁচু স্থানে বীজতলা বা ট্রে-নার্সারি পদ্ধতির বিস্তার জরুরি। পরিবর্তিত জলবায়ুর প্রেক্ষাপটে রোপণ ক্যালেন্ডার পুনর্বিন্যাস করে অঞ্চলভিত্তিক কন্টিনজেন্সি প্ল্যান তৈরি করতে হবে। ভারী বৃষ্টিপাতে সারের অপচয় রুখতে সুষম সার ভাগে ভাগে প্রয়োগ করা এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয় প্রয়োজন। পোকার আক্রমণ দমনে কীটনাশকের নির্বিচার ব্যবহার রোধ করে ফেরোমন ফাঁদ বা আলোক ফাঁদের মতো সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করা উচিত।

জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় আমন ধানের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করতে গবেষণা, সম্প্রসারণ, উপকরণ সরবরাহ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক সহায়তার পুরো ব্যবস্থাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে কাজ করতে হবে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবিত জলবায়ু-সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি দ্রুত কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে পৌঁছাতে হবে। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য মানসম্মত বীজ, চারা ও সারের পর্যাপ্ত মজুত রাখার পাশাপাশি সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে কৃষিঋণ এবং ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিআরআরআই এর লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট বা এলএসটিডি প্রকল্প দেশের বিভিন্ন কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি যাচাই, উপযোগী জাত নির্বাচন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আমন উৎপাদনের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশের আমন ধান আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক রেকর্ড উৎপাদন যেমন আমাদের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অনিশ্চয়তা আমাদের সতর্ক সংকেত দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেও কৃষিকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জলবায়ু-সহনশীল খাতে রূপান্তরের অঙ্গীকার রয়েছে, যেখানে ন্যানো ইউরিয়ার মতো আধুনিক প্রযুক্তি এবং বন্যা-জলাবদ্ধতা সহনশীল জাতের সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আমন ধানের উৎপাদন ও ক্ষতি মোকাবিলার প্রশ্নটি এখন আর কেবল কৃষকের মৌসুমি চাষাবাদের বিষয় নয়; এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা ও বাজার স্থিতিশীলতার মূল চাবিকাঠি। এই অভিজ্ঞতাকে সঠিক নীতি ও মাঠপর্যায়ের কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করতে পারলে আমন ধান হয়ে উঠবে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভরসা।


প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং 
প্রকল্প পরিচালক, এলএসটিডি প্রকল্প
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট





Loading...
Loading...


মতামত এর আরও খবর
সম্পাদক ও প্রকাশক:
আবুল হাসান মো: আল ফারুক
ঠিকানা: ৯/এফ, এইচআরসি ভবন, ৪৬, কাওরান বাজার বা/এ, ঢাকা- ১২১৫।
নিউজ- 01841042597, বিজ্ঞাপন- 01841011947, 01841042595, সার্কুলেশন- 01841042599, ই-মেইল : [email protected]
কপিরাইট © বাংলাদেশ বুলেটিন সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত
 About Us    Contact Us    Privacy Policy    Terms & Conditions    Editorial Policy    Correction Policy