ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের মাঠে এবার চোখে পড়ছে একঝাঁক তরুণ মুখ। পোস্টার, টকশো, পডকাস্ট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি স্পষ্ট। বিএনপি, এনসিপি থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাম ধারার দল, সবখানেই নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ বেড়েছে। তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে তাঁরা রাজনীতিকে ভিন্নভাবে দেখার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে- এই নতুন মুখগুলো কি সত্যিই নতুন রাজনীতির সূচনা করছে, নাকি পুরনো রাজনীতিই ফিরছে নতুন মোড়কে?
এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম আলোচনায় এসেছে, তাঁদের মধ্যে আছেন হুম্মাম কাদের চৌধুরী, ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, সারজিস আলম, নাসীর উদ্দীন পাটোয়ারী, তাসনিম জারা, ব্যারিস্টার মীর হেলাল, সাইয়েদ আল নোমান, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, চৌধুরী নায়াব ইউসুফসহ আরও অনেকে। বয়সে তারা তুলনামূলক তরুণ, বক্তব্যেও আধুনিকতার ছাপ রয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক কাঠামো কতটা বদলাচ্ছে সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে এবাবের নিবাচনে।
গত ২৫ ডিসেম্বর, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর রাজনীতিতে পরিবর্তনের সুর শোনা যাচ্ছে। দলীয় নেতারা বলছেন, মিছিল-মিটিং করে মানুষকে হয়রানি না করা এবং প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসাই তাঁদের লক্ষ্য। সভা-সেমিনারে যেমন তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, তেমনি মনোনয়নেও এসেছে নতুন মুখ। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল প্রজন্ম বদলালেই রাজনীতির চরিত্র বদলায় না। আসনের সমীকরণ ও জোটের দর কষাকষির রাজনীতি অব্যাহত থাকলে বদলের প্রত্যাশা পূরণ হবে না।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ও বিভিন্ন নাগরিক আন্দোলনে সক্রিয় থাকা তরুণদের একটি অংশ এবার সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশ নিয়েছেন। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা এসব নেতার প্রার্থিতা নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। কেউ কেউ একে আন্দোলনের স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিণতি বলছেন। তবে ২০১৮ সালের আন্দোলনে যারা নিজেদের অরাজনৈতিক বলে দাবি করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখন দল গঠন করেছেন বা প্রচলিত রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, আন্দোলন থেকে নির্বাচনে আসা নতুন নয়। ইতিহাসে বহু রাজনৈতিক নেতৃত্বই গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। তুলনামূলক তরুণ দল এনসিপির ঘোষিত ২৭ জন প্রার্থীর সবাই তরুণ এবং তারা নতুন রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।
বিএনপির ক্ষেত্রে নতুন মুখের একটি বড় অংশ এসেছেন রাজনৈতিক উত্তরাধিকার সূত্রে। একসময় দলের প্রভাবশালী নেতাদের সন্তানরাই এখন প্রার্থী হচ্ছেন। আবদুল্লাহ আল নোমানের ছেলে সাইয়েদ আল নোমান, মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল এবং সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী তার উদাহরণ।
জোটগত সমঝোতার কারণে বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে রুমিন ফারহানা স্বতন্ত্র(হাঁস প্রতীক) প্রার্থী হয়েছেন। একইভাবে ডা. তাসনিম জারা এনসিপি ছেড়ে স্বতন্ত্র(ফুটবল প্রতীক) হিসেবে মাঠে নেমেছেন। গণঅধিকার পরিষদের নেতা নুরুল হক নূর বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। অন্যদিকে গণসংহতি আন্দোলন ও বাসদ (মার্কসবাদী) তরুণ ও নারী প্রার্থী বাড়ানোর দাবি তুলেছে।
নুরুল হক নূর বলেন, মানুষের পরিবর্তনের প্রত্যাশা যেমন চাপ তৈরি করছে, তেমনি পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তও বড় বাধা। কালো টাকার আধিপত্য ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো সহজ নয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রাজনীতি এখন অনেকাংশেই ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। এদিকে সাংবাদিক মাসুদ কামালের বলছেন, মুখ বদলেছে, রাজনীতি বদলায়নি। সব মিলিয়ে, ভোটের মাঠে তরুণদের উপস্থিতি বাড়লেও নতুন রাজনীতির প্রশ্নটি এখনো উত্তরহীনই থেকে যাচ্ছে বলে দাবি তাঁর।